top of page

লাস্ট মিনিট ডিটক্স ডায়েট | সোলো ট্রিপের সাত-সতেরো | কোরিয়ান হেয়ার-কাট | রবিবারের গল্প: ঠিকানা


লাস্ট মিনিট ডিটক্স ডায়েট

নিজস্ব প্রতিনিধি


পুজোর আগে ওজন কমানোর তাগিদে অনেকেই হঠাৎ করে ‘ডিটক্স ডায়েট’-এর দিকে ঝুঁকে পড়েন। কিন্তু ডিটক্স মানেই না খেয়ে থাকা, শুধু ফলের রস খাওয়া কিংবা কয়েক দিন ধরে অত্যন্ত কম ক্যালরির খাবারে থাকা নয়। শরীরের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়া, লিভার ও কিডনি প্রতিদিনই বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশনের কাজ করে। তাই পুজোর আগে শরীরকে হালকা রাখতে চাইলে প্রয়োজন এমন একটি সাত দিনের খাদ্যাভ্যাস, যেখানে থাকবে পর্যাপ্ত জল, শাকসবজি, ফল, প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং পরিমিত কার্বোহাইড্রেট। এতে ওজন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ত্বকও পেতে পারে সতেজ ও উজ্জ্বল চেহারা।



সাত দিনের সহজ ডিটক্স ডায়েট


প্রথম দিন—শরীরকে প্রস্তুত করার দিন

সকালে ঘুম থেকে উঠে এক গ্লাস স্বাভাবিক বা হালকা উষ্ণ জল দিয়ে দিন শুরু করা যেতে পারে। প্রাতরাশে থাকুক ওটস, দুধ বা দইয়ের সঙ্গে আপেল, পেয়ারা কিংবা পেঁপে। দুপুরে অল্প ভাত বা দু’টি রুটি, ডাল, প্রচুর সবজি এবং মাছ। বিকেলে গ্রিন টি বা লেবু ছাড়া সাধারণ হার্বাল চা এবং এক মুঠো বাদাম। রাতে রুটি, মিশ্র সবজি ও ডিম বা হালকা মাছের ঝোল। অতিরিক্ত নুন, মিষ্টি, ভাজাভুজি ও প্যাকেটজাত খাবার এড়িয়ে চলুন।


দ্বিতীয় দিন—সবুজ শাকসবজির উপর জোর

প্রাতরাশে সবজি দিয়ে তৈরি চিঁড়ে বা উপমা। মাঝখানে একটি ফল। দুপুরে রুটি বা অল্প ভাতের সঙ্গে ডাল, পালং বা অন্য শাক, লাউ, পটল কিংবা ঝিঙের তরকারি এবং মাছ। বিকেলে শসা, গাজর বা টমেটোর সালাদ। রাতে সবজি স্যুপের সঙ্গে ডিমের ঝোল অথবা গ্রিল করা মাছ। সবজির বৈচিত্র্য যত বেশি হবে, ততই খাবার থেকে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, খনিজ ও আঁশ পাওয়া সহজ হবে।


তৃতীয় দিন—প্রোটিনের দিন

ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু সবজি খেলেই হবে না, পর্যাপ্ত প্রোটিনও জরুরি। সকালে দু’টি সেদ্ধ ডিমের সঙ্গে একটি আটার রুটি ও একটি ফল খেতে পারেন। দুপুরে অল্প ভাত, ডাল, মাছ বা মুরগি এবং সবজি। বিকেলে টক দই বা এক মুঠো বাদাম। রাতে পনির, ডিম, মাছ কিংবা মুরগির সঙ্গে প্রচুর সবজি। রান্নায় অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করাই ভালো।



চতুর্থ দিন—আঁশ বাড়ানোর দিন

সকালে দই, ওটস ও পেঁপে বা পেয়ারা দিয়ে হালকা খাবার। দুপুরে রুটি, ডাল, মিশ্র সবজি ও মাছ। বিকেলে একটি ফল এবং কয়েকটি বাদাম। রাতে মুগ ডালের খিচুড়ি তৈরি করতে পারেন প্রচুর সবজি দিয়ে। পর্যাপ্ত আঁশ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমাতে সহায়ক হতে পারে।


পঞ্চম দিন—রঙিন খাবারের দিন

প্লেটে যত বেশি রঙের প্রাকৃতিক খাবার, তত বেশি ধরনের পুষ্টি পাওয়ার সুযোগ। প্রাতরাশে সবজি-সহ ডিমের অমলেট ও রুটি। দুপুরে ভাত, ডাল, বিট, গাজর, পটল বা অন্য সবজি এবং মাছ। বিকেলে পেয়ারা, কমলা কিংবা ডালিম। রাতে সবজি ও মুরগির হালকা ঝোলের সঙ্গে রুটি। ফলের রসের বদলে গোটা ফল খান—তাতে আঁশও পাওয়া যায় এবং দ্রুত বেশি পরিমাণে চিনি গ্রহণের সম্ভাবনাও কমে।


ষষ্ঠ দিন—হালকা, কিন্তু পুষ্টিকর

সকালে সেদ্ধ ডিম, রুটি ও শসা। দুপুরে অল্প ভাত, ডাল, শাক-সবজি ও মাছ। বিকেলে গ্রিন টি বা পুদিনা চা এবং কয়েকটি বাদাম। রাতে সবজি, ডাল ও ডিম দিয়ে তৈরি হালকা খাবার। সারাদিন পর্যাপ্ত জল পান করুন। তৃষ্ণা না পেলেও নিয়মিত জল খাওয়ার অভ্যাস রাখুন।



সপ্তম দিন—ভারসাম্যের দিন

শেষ দিনে কোনও ‘শুধু ফল’ বা ‘শুধু তরল’ ডায়েটের প্রয়োজন নেই। সকালে ওটস বা সবজি-সহ চিঁড়ে, দুপুরে অল্প ভাতের সঙ্গে মাছ, ডাল ও সবজি, বিকেলে ফল ও বাদাম এবং রাতে রুটি, সবজি ও ডিম বা মাছ রাখতে পারেন। অর্থাৎ সাত দিনের শেষে আবার স্বাভাবিক, সুষম খাদ্যাভ্যাসেই ফিরে আসুন।


ঝলমলে ত্বকের জন্য প্লেটে কী থাকবে?


পুজোর আগে ত্বককে উজ্জ্বল দেখাতে শুধু দামি প্রসাধনী নয়, খাবারের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ পেয়ারা, আমলকি, কমলালেবু, লেবু, টমেটো ইত্যাদি খাদ্যতালিকায় রাখা যায়। গাজর, কুমড়ো ও অন্যান্য রঙিন সবজিতে থাকা ক্যারোটিনয়েডও সুষম খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাদাম, বীজ ও মাছ থেকে পাওয়া স্বাস্থ্যকর চর্বি ত্বকের স্বাভাবিক গঠন বজায় রাখতে সাহায্য করে। ডাল, ডিম, মাছ, দই ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারও বাদ দেওয়া চলবে না।

আর একটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—জল। পর্যাপ্ত জল পান শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্ম বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে বেশি জল খেলেই শরীর থেকে ‘টক্সিন’ বেরিয়ে গিয়ে ত্বক রাতারাতি ঝলমলে হয়ে যাবে—এমন দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।


এই সাত দিনে যা কমাবেন

পুজোর আগে কয়েক দিনের জন্য কোমল পানীয়, অতিরিক্ত মিষ্টি, অতিরিক্ত নুন, ভাজাভুজি, ফাস্ট ফুড, অতিরিক্ত মশলাদার খাবার এবং অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে দিন। অ্যালকোহল থাকলে তা এড়িয়ে চলাই ভালো। ‘ডিটক্স ওয়াটার’, ডিটক্স জুস বা হার্বাল পানীয়কে কোনও জাদুকরি ওজন কমানোর উপায় হিসেবে দেখবেন না।

সবচেয়ে বড় কথা, সাত দিনে ৪–৫ কেজি ওজন কমানোর মতো কঠোর লক্ষ্য না রেখে ধীরে, টেকসইভাবে ওজন কমানোর দিকে নজর দেওয়া উচিত। অতিরিক্ত ক্যালরি কমিয়ে দিলে সাময়িকভাবে ওজনের পরিবর্তন দেখা গেলেও তার একটা অংশ জলীয় ওজন হতে পারে। পুজোর আগে শরীরকে দুর্বল করে নয়, বরং হালকা, সতেজ এবং কর্মক্ষম রেখেই প্রস্তুতি নেওয়া ভালো।



সাত দিনের এই খাদ্যতালিকার সঙ্গে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত জীবনযাপন যোগ করতে পারলে ফল আরও ভালো হতে পারে। আর কোনও শারীরিক সমস্যা, গর্ভাবস্থা, স্তন্যদান, ডায়াবেটিস, কিডনি বা লিভারের অসুখ কিংবা খাওয়াদাওয়া সংক্রান্ত বিশেষ প্রয়োজন থাকলে ব্যক্তিগত ডায়েট শুরু করার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। পুজোর আগে ‘ডিটক্স’-এর আসল মন্ত্র তাই না খেয়ে থাকা নয়—পরিমিত খাওয়া, বেশি প্রাকৃতিক খাবার, পর্যাপ্ত জল, নিয়মিত হাঁটা এবং ভালো ঘুম। শরীর যখন ভেতর থেকে সুস্থ থাকে, তার ছাপ অনেক সময় মুখেও ফুটে ওঠে।

সোলো ট্রিপের সাত-সতেরো


নিজস্ব প্রতিনিধি


পুজোর ছুটি মানেই কি বন্ধুদের দল, পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া কিংবা একগুচ্ছ মানুষের সঙ্গে হইচই? একেবারেই নয়। কখনও কখনও উৎসবের ভিড় থেকে একটু দূরে গিয়ে নিজের সঙ্গে কয়েকটা দিন কাটানোর ইচ্ছেটাও বেশ প্রবল হয়ে ওঠে। তাই পুজোর ছুটিতে একা বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন অনেকেই। কারও কাছে এটি স্বাধীনতার স্বাদ, কারও কাছে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ। তবে একা ভ্রমণের যেমন বেশ কিছু আকর্ষণ রয়েছে, তেমনই রয়েছে কিছু বাস্তব অসুবিধাও।


একা বেড়ানোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হল নিজের সময় নিজের মতো করে ব্যবহার করার স্বাধীনতা। সকালে ঘুম থেকে উঠে কোথাও বেরোবেন, নাকি আরও কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকবেন, তা ঠিক করার জন্য কাউকে অপেক্ষা করতে হবে না। কোনও নির্দিষ্ট জায়গা ঘুরে দেখার ইচ্ছা না থাকলে সারা দিন হোটেল, রিসর্ট কিংবা হোমস্টেতে কাটিয়েও দিতে পারেন। খাবারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কোথায় খাবেন, কী খাবেন কিংবা কোনও নির্দিষ্ট সময়ে খেতেই হবে কি না— সব সিদ্ধান্তই আপনার।



দলবদ্ধ ভ্রমণে অনেক সময় সবার পছন্দকে একসঙ্গে মেলানো কঠিন হয়ে যায়। কেউ পাহাড়ে হাঁটতে চান, কেউ আবার ক্যাফেতে বসে থাকতে চান। কেউ ভোরে বেরোতে উৎসাহী, অন্য জনের তখনও ঘুম ভাঙেনি। একা ভ্রমণে এই সমঝোতার প্রয়োজন নেই। নিজের আগ্রহ অনুযায়ী গন্তব্য বেছে নিয়ে নিজের গতিতে ঘুরে বেড়ানো যায়।


একা ভ্রমণের আরও একটি বড় দিক হল নতুন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা। সঙ্গী না থাকায় অনেক সময় স্থানীয় মানুষ, সহযাত্রী কিংবা অন্য পর্যটকদের সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবেই কথাবার্তা শুরু হয়ে যায়। তাঁদের জীবনযাপন, স্থানীয় সংস্কৃতি, খাবারদাবার কিংবা জায়গাটির অজানা গল্প সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে ভ্রমণ শুধু দর্শনীয় স্থান দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; হয়ে উঠতে পারে নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পথ।


নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগও একলা ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। প্রতিদিনের ব্যস্ততা, কাজের চাপ এবং পরিচিত পরিবেশের বাইরে গিয়ে কিছুদিন নিজের ইচ্ছেমতো থাকা অনেকের কাছেই স্বস্তিদায়ক হতে পারে। অচেনা জায়গায় নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হয়। কোথায় যাবেন, কী ভাবে যাবেন, কোনও সমস্যায় কী করবেন— প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের উপর নির্ভর করতে হয়। ফলে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ার সুযোগও তৈরি হয়।



তবে একা ভ্রমণের ছবিটা সবসময় এতটা সহজ নয়। আনন্দের মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়ার জন্য পাশে পরিচিত কেউ না থাকাটা কখনও কখনও মন খারাপের কারণ হতে পারে। কোনও অসাধারণ দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হলেন, দারুণ কোনও খাবার খেলেন কিংবা হঠাৎ কোনও মজার ঘটনা ঘটল— সঙ্গে কেউ না থাকলে সেই মুহূর্তের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিরাপত্তা। একা ভ্রমণে নিজের যাবতীয় দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়। অচেনা জায়গায় যাতায়াত, রাতের সময়ে বাইরে থাকা, প্রয়োজনীয় নথি ও মূল্যবান জিনিসপত্র সামলে রাখা— সব ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন। গন্তব্য সম্পর্কে আগে থেকে তথ্য সংগ্রহ করা, থাকার জায়গা বেছে নেওয়ার সময় নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিজের ভ্রমণসূচি কাছের মানুষকে জানিয়ে রাখা তাই জরুরি।


হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেও সমস্যাটা তুলনামূলক বেশি হতে পারে। শরীর খারাপ হলে ওষুধ আনা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা কিংবা বাইরে গিয়ে খাবার সংগ্রহ— প্রতিটি কাজই তখন নিজেকেই সামলাতে হয়। একই ভাবে বড় ব্যাগ বা একাধিক লাগেজ নিয়ে একা যাতায়াতের ক্ষেত্রেও কিছুটা অসুবিধা হতে পারে। স্টেশন বা বিমানবন্দরে মালপত্র সামলে চলাফেরা করা, প্রয়োজনের সময় শৌচাগারে যাওয়া কিংবা যানবাহন বদলানোর মতো ছোটখাটো বিষয়ও তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।



খরচের হিসেবটাও মাথায় রাখা দরকার। দু’জন বা তার বেশি মানুষ একসঙ্গে গেলে হোটেলের ঘর, গাড়ি কিংবা অন্য কিছু খরচ ভাগ করে নেওয়া সম্ভব। একা গেলে সেই পুরো খরচটাই বহন করতে হয়। ফলে একই ভ্রমণসূচিতে একা ভ্রমণের বাজেট অনেক সময় তুলনামূলক বেশি হতে পারে।


তাই একা বেড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের স্বভাব, অভিজ্ঞতা, গন্তব্য এবং ভ্রমণের ধরন— সবকিছু বিবেচনা করা ভাল। প্রথমবার একা বেড়াতে গেলে খুব দীর্ঘ বা জটিল ভ্রমণসূচির বদলে পরিচিত বা তুলনামূলক সহজ কোনও গন্তব্য বেছে নেওয়া যেতে পারে। আগে থেকে থাকার জায়গা, যাতায়াত, জরুরি যোগাযোগের নম্বর এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র গুছিয়ে রাখাও জরুরি।


আর যদি একা ভ্রমণ করবেন কি না, তা নিয়ে এখনও দ্বিধা থাকে, তবে নেওয়া যেতে পারে মাঝামাঝি একটি পথ। পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সঙ্গে একই গন্তব্যে যাওয়ার পরিকল্পনা করে তাঁদের কয়েক দিন আগে সেখানে পৌঁছে যেতে পারেন। সেই সময়টা নিজের মতো করে একা কাটিয়ে পরে বাকিদের সঙ্গে যোগ দেওয়া যায়। এতে একদিকে যেমন একলা ভ্রমণের স্বাদ পাওয়া যাবে, অন্যদিকে পরিচিত মানুষদের সঙ্গে পুজোর আনন্দও ভাগ করে নেওয়া সম্ভব হবে।



শেষ পর্যন্ত একা ভ্রমণ সবার জন্য একই রকম অভিজ্ঞতা নয়। কারও কাছে এটি স্বাধীনতার আনন্দ, কারও কাছে আত্মঅন্বেষণের সুযোগ, আবার কারও কাছে নিঃসঙ্গতার অভিজ্ঞতা। তাই পুজোর ছুটিতে একা পথ চলার আগে শুধু গন্তব্য নয়, নিজের পছন্দ এবং প্রস্তুতিকেও গুরুত্ব দিন। কারণ ভ্রমণের সেরা সঙ্গী কখনও কখনও অন্য কেউ নয়— নিজের স্বচ্ছন্দ মনটিই।

কোরিয়ান হেয়ার-কাটে জেন-জি


নিজস্ব প্রতিনিধি


বর্তমানে কোরিয়ান ও জাপানি অনুপ্রেরণায় বদলে যাচ্ছে জেন-জ়ির হেয়ারস্টাইল। পুজো মানেই নতুন পোশাক, নতুন সাজ আর নিজেকে একটু অন্য রকম করে আবিষ্কার করার আনন্দ। প্রতি বছরই পুজোর ফ্যাশনে আসে নতুন কোনও প্রবণতা। কখনও পোশাকে ফিরে আসে পুরনো দিনের ছোঁয়া, কখনও মেকআপে দেখা যায় নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আর এ বছর সেই বদলের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে চুল।


বিশেষ করে জেন-জ়ি প্রজন্মের মধ্যে চুল নিয়ে দেখা যাচ্ছে বেশ কিছু নতুন প্রবণতা। প্রচলিত কাটের বাইরে গিয়ে তাঁরা বেছে নিচ্ছেন এমন হেয়ারস্টাইল, যার মধ্যে রয়েছে আধুনিকতা, স্বতন্ত্রতা এবং আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের প্রভাব। কোরিয়ান ও জাপানি জনপ্রিয় সংস্কৃতির প্রভাবেই হোক কিংবা নিজের লুক নিয়ে পরীক্ষা করার ইচ্ছা— পুজোর আগে ছোট চুলের দিকে ঝুঁকছেন অনেক তরুণ-তরুণী।


একসময় পুজোর আগে চুল বড় করে রাখার প্রবণতা ছিল বেশ জোরালো। লম্বা চুলে নানা ধরনের বেণি, খোঁপা কিংবা খোলা চুলের সাজ করার পরিকল্পনা থাকত অনেকের। কিন্তু এখন সেই ধারণা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। লম্বা চুল কেটে ছোট করে ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে আর দ্বিধা করছেন না অনেকে। বরং ছোট চুলকেই মনে হচ্ছে আরও আধুনিক, স্বচ্ছন্দ এবং ব্যক্তিত্ব প্রকাশের উপযোগী।



পিক্সি কাট থেকে ইনভার্টেড বব, লং বব থেকে উল্ফ কাট— একাধিক স্টাইল জায়গা করে নিচ্ছে পুজোর সাজে। তার সঙ্গে রয়েছে অ্যাসিমেট্রিক কাট, ওয়েজ কাট এবং ফেড-আউটের মতো আরও কিছু ভিন্নধর্মী স্টাইল। এই কাটগুলির বিশেষত্ব হল, প্রচলিত সৌন্দর্যের ধারণার বাইরে গিয়ে মুখের গড়ন ও ব্যক্তিত্বকে আলাদা ভাবে তুলে ধরার সুযোগ।


জেন-জ়ির হেয়ারস্টাইলে কোরিয়ান ও জাপানি প্রভাবও স্পষ্ট। ওটিটি সিরিজ, আন্তর্জাতিক বিনোদন জগত এবং সমাজমাধ্যমের দৌলতে বিভিন্ন দেশের ফ্যাশন এখন খুব সহজেই পৌঁছে যাচ্ছে ঘরে ঘরে। ফলে পর্দায় দেখা কোনও অভিনেতা বা জনপ্রিয় চরিত্রের হেয়ারস্টাইল থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নিজের লুক বদলে ফেলাটা এখন আর অস্বাভাবিক নয়। বরং নিজের পছন্দের সংস্কৃতি বা ফ্যাশনকে চেহারায় ফুটিয়ে তোলাটাও হয়ে উঠেছে ব্যক্তিত্ব প্রকাশের একটি মাধ্যম।


চুলের দৈর্ঘ্যের পাশাপাশি রঙেও এসেছে পরিবর্তন। একসময় লাল, সোনালি কিংবা বাদামি রঙের বিভিন্ন শেডই ছিল চুল রাঙানোর প্রধান পছন্দ। এখন সেই গণ্ডি পেরিয়ে আরও উজ্জ্বল ও ব্যতিক্রমী রঙের দিকে আগ্রহ বাড়ছে। গোলাপি, বেগুনি, নীল কিংবা লাল ও খয়েরির মিশ্র শেডে চুল রাঙানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ পুরো চুল না রাঙিয়ে হাইলাইটের মাধ্যমে লুকে আনছেন পরিবর্তন। প্ল্যাটিনাম বা সাদা আভাযুক্ত হাইলাইটও নজর কাড়ছে।



এই প্রবণতার পিছনে রয়েছে নিজের চেহারায় দ্রুত পরিবর্তন আনার ইচ্ছাও। ব্যস্ত জীবনযাত্রায় প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে চুলের পরিচর্যা করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই এমন কাটের চাহিদা বাড়ছে, যা দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ার পাশাপাশি তুলনামূলক ভাবে সহজে সামলানো যায়। অর্থাৎ হেয়ারস্টাইল এখন শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, হয়ে উঠছে জীবনযাপনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত।


তবে কোনও ট্রেন্ডই চোখ বন্ধ করে অনুসরণ করার বিষয় নয়। একই হেয়ারকাট একজনের মুখে যেমন দারুণ মানাতে পারে, অন্যজনের ক্ষেত্রে তেমন নাও লাগতে পারে। মুখের আকৃতি, চুলের ঘনত্ব, চুলের স্বাভাবিক গঠন এবং ব্যক্তিগত সাজের ধরন— সবকিছুর কথা মাথায় রেখেই কাট বেছে নেওয়া প্রয়োজন। পুজোর আগে হঠাৎ করে কোনও নতুন কাট করার বদলে নিজের মুখ ও চুলের সঙ্গে কোন স্টাইলটি মানানসই, তা আগে থেকেই ভেবে নেওয়া ভাল।


আর নতুন কাটের সঙ্গে চাই চুলের যত্নও। পুজোর কয়েক দিন ঘোরাঘুরি, রাত জাগা, স্টাইলিং এবং মেকআপের ব্যস্ততায় চুলের উপরেও চাপ পড়ে। তাই চুলের ধরন অনুযায়ী কন্ডিশনার, লিভ-ইন কন্ডিশনার বা সিরাম ব্যবহার করা যেতে পারে। হেয়ার স্প্রে কিংবা হোল্ডিং ক্রিম ব্যবহার করলে দিনের শেষে চুল পরিষ্কার করে নেওয়াও জরুরি।



সব মিলিয়ে এ বছরের পুজোয় হেয়ারস্টাইলের ভাষা বেশ বদলেছে। পুরনো পরিচিত কাটের পাশাপাশি জায়গা করে নিচ্ছে আন্তর্জাতিক অনুপ্রেরণায় তৈরি নতুন স্টাইল। ছোট চুল, ভিন্নধর্মী কাট, সাহসী রং আর কোরিয়ান-জাপানি ছোঁয়া— জেন-জ়ির পুজোর সাজে চুল যে এ বার বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চলেছে, তা বলাই যায়। নিজের মতো করে সাজা, নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া এবং চেনা লুকের বাইরে গিয়ে নতুন কিছু করার সাহসই হয়ে উঠছে এবারের হেয়ার ফ্যাশনের মূল কথা।

রবিবারের গল্প: ঠিকানা


অভীক চন্দ্র


আজও সাতটার সময় যখন তিতলি সকালের হাঁটাহাঁটি সেরে ঘর্মাক্ত শরীরে বাড়িতে ঢুকল, ওর ঠোঁটের দীর্ঘ অকর্মণ্যতা ভেদ করে বেরিয়ে এল এক নিঃশ্বাসের মতো বিরক্তি, যেন শান্ত সকালটা হঠাৎ অশান্তির আঁচ পেয়ে ফুঁসে উঠল। জুতো খুলতে খুলতেই ও আপনমনে বলল, এ কে রে বাবা! রোজ রোজ একটা করে এসেই যাচ্ছে!


ও নিঃশব্দে এক গ্লাস জল খেল— যেন জল নয়, নিজের বিরক্তির খানিকটা নেমে গেল কণ্ঠনালি দিয়ে। চিঠিটা পড়বে না পড়বে না করেও খামটা ছিঁড়ে ফেলল। কৌতূহল আজকাল ওকে বড্ড বেশি পেয়ে বসেছে। আগে পরিবারের দশটা মানুষের মাঝে বন্দি থাকায় নিজেকে চেনার সুযোগ হয়নি, এখন কিছুটা হয়েছে।



ধীরেসুস্থে কাগজটা নামিয়ে রাখল তিতলি। আজকেরটা নিয়ে পাঁচ নম্বর চিঠি। সাদা, সাধারণ খাম, কোনো নাম নেই, স্ট্যাম্প নেই। শুধু গোটা গোটা হরফে লেখা— ‘মা তোমার জন্য।’ আগের চারটির মতোই। নিঃসন্দেহে কোনো বাচ্চার হাতের লেখা, অথচ ভেতরে পরিণত ভাষা, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের আবেগপূর্ণ চাওয়া। তাও আবার তিতলিকে উদ্দেশ্য করে।


তিতলি জানে, ওকে সুন্দরী কোনোভাবেই বলা যায় না। যৌবনেও কোনো অযাচিত প্রেমের মুখোমুখি হয়নি, বিয়ের পর তো নয়ই। তাছাড়া পাড়ায় সবাই জানে ও ডিভোর্সি, যে ক’জন পুরুষমানুষের সঙ্গে পরিচয় আছে তারা সবাই ওকে সমীহ করেন। তাই প্রথম চিঠিটা পেয়ে ও গা করেনি। কিন্তু পরপর চিঠিগুলোর লেখা পড়ে বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠেছিল— ‘তোর দু-গাল বেয়ে বৃষ্টি নামলে আমার শৈশব ফিরে আসে, তিতলি…’


কিন্তু এ আবার কেমন বিড়ম্বনা! মা তোমার জন্য? তিতলি তো এ জীবনে কারোর মা হতেই পারল না। এইটুকু খামতিই ওর জীবনের বাকি ভালোটা শুষে নিল। কোন্‌ বাচ্চা ওকে মা বলতে চায়? কে-ই বা ওকে নিজের প্রেমিকা বানাতে চায়? অসম্ভব!



প্রেসার কুকারে একের পর এক সিটি বাজতেই থাকে, বার্নার বন্ধ করতেই তিতলির খেয়াল হল ওর আজ অফিস ছুটি। ইলেকট্রিক বিল, ব্লাউজ পিস্‌, এক প্যাকেট মুড়ি, একশো মুড়কি, ডিটারজেন্ট — দুত্তোর! গোল্লায় যাক সব, আগে এই চিঠির রহস্যভেদ করতেই হবে।


প্রতিদিন ভোরে একটা করে খাম পড়ে থাকে গেটের ভেতরে। কখনও পাপোশের ওপর, কখনও নয়নতারার ডালে, কখনও আবার সাইকেলের চাকার নিচে। ওর মানে যে সময়টায় তিতলি মর্নিং ওয়াক সেরে বাড়ি ফিরে আসে, ওর মধ্যেই কেউ ছুঁড়ে দিয়ে যায় চিঠিগুলো।


তিতলি কিছুদিন ধরে লক্ষ করছে— চিঠিগুলোর শব্দে একটা অদ্ভুত ঘনিষ্ঠতা আছে। লেখক ওর শৈশবের খুঁটিনাটি ঘটনা জানে, সেই লাল ফ্রকটার কথা, যেটা পরে ও স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশানে নেচেছিল। পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ উঠে গেছিল বলে নাচতে খুব কষ্ট হয়েছিল তিতলির। এছাড়া মাধ্যমিকে পিছনের জনকে পাঁচ নম্বরের উপপাদ্য দেখাতে গিয়ে ওর নিজের দশ নম্বরের উত্তর ফসকে যাওয়া, এমনকি ওর কোমরের লাল জড়ুলটার কথাও জানে সে।



পরদিন ভোরে তিতলি আর বেরোল না। দেখা যাক কখন চিঠি আসে। কত লোক রাস্তায়, কার দিকেই বা একটানা নজর রাখা যায়।


একটা স্কুলভ্যান এসে থামে। তিতলি জানালার দিকে এগিয়ে গেল। দেখল, সামনের বাড়ির বাচ্চাটাকে আনতে নামল ভ্যানওলা রাজু। আর সেই মুহূর্তে— তিতলির চোখ আটকে গেল।


ভ্যানের ভিতর থেকে এক ছোট মেয়ে, বয়স ছয়-সাত, নাকে একটা জড়ুল, স্কুল ড্রেসে, দুটো বেণী দুলছে— খানিক এদিক-ওদিক তাকিয়ে, হঠাৎ ছোট্ট হাতে একটা খাম তুলে ছুঁড়ে দিল তিতলির বারান্দার দিকে। খামটা দুর্ভাগ্যবশত হাওয়ায় পাক খেয়ে এসে পড়ল জলের বালতিতে।


তিতলি হুড়মুড় করে দৌড়ে গেল খামটা তোলার জন্য। ততক্ষণে ভ্যান চলে গেল, বাতাসে ধুলো ঘুলিয়ে উঠল।


ও দরজা খুলে খামটা তুলল। এবার খামের ভেতরে অন্যরকম কাগজ। হলদেটে, পুরোনো, ডায়েরি থেকে ছিঁড়ে নেওয়া। তারিখ ২৭শে মে, ২০১৩। কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা— আজ তোর সাথে শেষবারের দেখাটাও সেরে ফেললাম। তুই যদি ফিরে আসিস কোনোদিন, তিতলি, তাহলে আমি আবার লিখব। মন থেকে কিছু চাইলে একদিন ঠিক পাওয়া যায়।


তিতলির স্মৃতি ঝাপসা হয়ে এল। ওই তারিখ ছিল মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোবার দিন, এতদিনের পরিচিত জায়গা, মানুষজন ছেড়েছুড়ে চলে যাওয়ার দিন। পাঠভবনে তিতলির আর পড়া হয়নি, মায়ের সঙ্গে বেলেঘাটার ভাড়াবাড়িটা ছেড়ে রাতারাতি চলে গিয়েছিল বর্ধমানে দেশের বাড়ি।



বাবা শেষের দিকে বারবার বলত ওকে, “কেন আমার জন্য এত খরচ করছিস সোনাই? কালরোগ কখনও সারে না মা। এবার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাব, মাকে নিয়ে ভাব। আমায় আর ধরে রাখিস না।”


তিতলি ভেবেছিল মার্কশিট এনে সবার আগে হসপিটালে ছুটে যাবে, বাবাকে দেখাবে। তখনও বাবার দৃষ্টিশক্তির কিছুটা অবশিষ্ট ছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।


বাড়ির তিন মাসের ভাড়া বাকি পড়ে গিয়েছিল। বাড়িওলা কত বছর ধরে ওদের চিনতেন, তিতলি হাঁটতে শেখার সময় থেকে ভালোকাকু বলে ডাকত। তিনি অবধি বললেন, ভাড়া মিটিয়ে আজকেই বাড়ি খালি করে দাও। এরপর ভাড়া বাড়বে, তোমরা তো আর দিতে পারবে না।


তিতলি তখন বলতে পারেনি, আমি তো বড়ো হয়ে গেছি মা। আমরা তো মানুষ, রাক্ষস তো নই যে এটুকুতে দুজনের পেট চলবে না। কিন্তু যা বলেছিল সেটাও যথেষ্ট ছিল। ওর হাতে ছিল নোটের একটা খাম।


“এ নাও মা। এটা থেকে ভাড়া মিটিয়ে দাও। আর এই মাসটা থাকতে দিতে বলো। অন্তত বাবার কাজটুকু…”


মায়ের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, “টাকা কোথায় পেলি তুই? কে দিল?”


“ও তো চিনি না মা। হসপিটালে যখন বিল মেটাচ্ছিলে, আমায় একটা লোক দিয়ে গেল। বলল, কেউ একজন আমার নাম করে এটা দিয়ে গেছেন।”


“তোর বাবা কাকে ধার দিয়েছিল রে? তোকে বলেছিল?”


তিতলি ঘাড় নেড়ে না বলেছিল। পুরোটাই ওর স্কলারশিপের টাকা, নিজেই চেক লিখে ব্যাঙ্ক থেকে তুলে এনেছিল তিতলি।


তারপর হু হু করে পাঁচ বছর কেটে গেল। তিতলির বিয়ে হল, ভেঙেও গেল। মাকে কিছু জানায়নি, জানানো হয়নি। দুই মামার সংসারে মা এমনিতেই নানা কথা শোনে, দিম্মার পেনশনই ভরসা। মা শুধু জানে, তার মেয়ে বিদেশে সুখে আছে।


তিতলি খোরপোশ চায়নি। পিটিশনে সই করার পর পরই একটা চাকরি পেয়ে গেল। অফিসের এক বান্ধবী বিয়ের পর চাকরি ছেড়ে দিলে, ওর বাড়িটাই তিতলি খুব সস্তায় কিনে নিল একটা লোন নিয়ে। একজন চাকরি পেল বিয়ের জন্য, আরেকজন চাকরি ছাড়ল বিয়ের জন্য।


এমন নিস্তরঙ্গ জীবনে এমন অযাচিত তরঙ্গ এই প্রথম। কে তাকে এমনভাবে ভালোবাসে? আর সেই বাচ্চাটাই বা কে? তিতলিকে সে ‘মা’ বলে ডাকছেই বা কেন?


মা হওয়ার সাধ তিতলির বহুদিনের। যে কারণে তার বিবাহিত জীবন তছনছ হয়েছিল, সেই শূন্যতা নিয়েই সে বেঁচে থাকতে চেয়েছিল। কারোর সাহায্য ছাড়াই খোঁজখবর নিয়ে গিয়েছিল ‘নবজন্ম ফাউন্ডেশন’-এ। রঙিন দেওয়াল, খেলনা, কার্টুনের পোস্টার। ও ঠিক করেছিল, এখান থেকেই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটা নেবে।


ওকে নিয়ে যাওয়া হল সেখানে, যেখানে বাচ্চাগুলো খেলছিল। একটা মেয়ের মুখের দিকে তাকাতেই তিতলির চোখ আটকে গেল— ঠিক যেমন বাবা বলত, “তোর ছেলেমেয়ে হলে তোর মতোই চোখ হবে। এমন দৃঢ়, যে আগুন দেখেও ভয় পায় না। যার চোখ এমন হয়, সে মনে মনে যা চায়, তাই পায়।”


নাঃ! তিতলি সেবারেও পায়নি। কারা যেন বাচ্চাটাকে দত্তক নিয়ে ফেলেছিল। পরদিনই ও চলে যাবে তাদের কাছে। তিতলি শুধু ওকে একটু আদর করে এসেছিল মাত্র।



বিদ্যুতের ঝটকা খাওয়ার মতন কেঁপে উঠল তিতলি। বাচ্চা মেয়েটার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াতে গিয়ে ওর নাকের জড়ুলটা খেয়াল করেছিল ও।


---


পরদিন তিতলি অনেকক্ষণ স্কুলভ্যানের সময় অনুযায়ী অপেক্ষা করল। ভ্যান আসেনি। পরদিনও না। তিতলির খেয়াল ছিল না যে পুজোর ছুটি শুরু হয়ে গেছে। চিঠির খামের মতোই নিঃশব্দে অদৃশ্য হয়ে গেল সেই বাচ্চাটাও।


বাজারে রাজুকে পাকড়াও করতেই জানতে পারল বাচ্চাটা মাসখানেক হল এই শহরে এসেছে। ওর বাবার বদলির চাকরি তো, তাই।


তিতলি বলল, “কোথায় থাকে জানিস?”


রাজু হাসল, “জানব না? তন্ময়দাকে সেই কবে থেকে চিনি। চৌধুরী বাড়ির ছোট ছেলে। আমার বাবা আগে ওদের রিটেল শপে কাজ করত। বিয়ে-থা করল না, বাচ্চাটাকে দত্তক নিল। কত ভালোবেসে মানুষ করছে ওকে।”


তিতলি প্রচণ্ড অবাক হল, “কী নাম বললি? তন্ময়? তন্ময় চৌধুরী?”


“আপনি চেনেন দিদিভাই?”


“চিনি মনে হচ্ছে। একবার ওর সাথে দেখা করাতে পারবি?”


“ওরা তো বাড়িতে নেই এখন। বেড়াতে গেছে। দিনদশেক পরে ফিরবে। ফোন নম্বর দিতে পারি আপনাকে।”


তিতলি একটু ইতস্তত করে বলল, “না থাক। ফিরলে জানাস আমাকে।”


তিতলি উদ্বিগ্ন হয়ে ফিরে এসে খোঁজ শুরু করল— বাড়ি বদল করতে করতে অ্যালবাম কোথায় ছুটে গেছে, কয়েকজন বন্ধুদের ফোন করেও কাজ হল না। কেউ তন্ময়ের খবর জানে না। কেউ বলল, ও নাকি চাকরির সূত্রে অন্য শহরে গেছে; কেউ বলল, ওর কবিতা লেখা বন্ধ হয়ে গেছে বহুদিন।



তিতলি শুধু মেলাতে চাইছিল যার কথা ভাবছে, এ-ই সে-ই কিনা। আদৌ ও-ই তো?


দিন গড়াল। চিঠি আসা বন্ধ। পুজোর পরের শহর সবসময় একটু বিষণ্ণ। আর তিতলির ভিতরটা এক ফাঁকা ডাকঘরের মতো। অপেক্ষার চিঠিতে ভর্তি, অথচ কোনো ডাকপিয়ন নেই।


একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল তিতলির। অমৃতা ম্যামের বিয়ের অনুষ্ঠানে ওর চুড়িদারের পিঠের দিকটায় ছিঁড়ে গিয়েছিল অনেকটা। ওড়না দিয়েও ঢাকা যাচ্ছিল না। তিতলি ঘাবড়ে গিয়ে লজের তিনতলার ফাঁকা ঘরটায় ঢুকে দরজা টেনে দিয়েছিল।


সেই সময় কেউ টোকা দিয়েছিল দরজায়।


তিতলি অনেকক্ষণ পরে সাড়া দিয়েছিল, “কে?”


“আমি তন্ময়, তিতলি। একবার দরজাটা খোল।”


“তুই! তুই কেন এসেছিস?”


“প্লিজ! একবার খোল তিতলি।”


তিতলি আড়ষ্ট হাতে দরজা খুলতেই দেখেছিল তন্ময়ের হাতে একটা গিফটের বাক্স। এদিক-ওদিক দেখে ও বলেছিল, “এটা পরে নে চট করে।”


তিতলি মুখ তুলেছিল, “কী এটা?”


“ম্যামকে আমি পরে গিফট করে দেব কিছু। আপাতত তুই শাড়িটা পরে নে। ভয় নেই, আমি দরজার বাইরে আছি। পরতে পারিস তো?”


তিতলি তন্ময়ের কথা না শুনে পারেনি। বিয়েবাড়িটা ছিল বাড়ি থেকে বহু দূরে, বাড়ি ফেরারও উপায় ছিল না।


কিন্তু জীবনে ফেরার উপায় থাকে। যে যত দূরেই চলে যাক না কেন। কালীপুজোর কিছু দিন আগে অফিস থেকে ফেরার পথে, একটা কেকের দোকানের সামনে তিতলি থমকে গেল।


সামনের ফুটপাথে এক ছোট মেয়ে, গায়ে স্কুল ইউনিফর্ম, দুই বেণী দুলছে, হাসছে। ও আইসক্রিম হাতে ঘুরে দাঁড়াল, আর তখনই তিতলি দেখল— ওর পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক মানুষ, চোখে গোল চশমা, ক্লান্ত মুখে শান্ত হাসি।


তন্ময়! হ্যাঁ, তন্ময়ও দেখেছে ওকে।


তিতলি গাড়িঘোড়ার তোয়াক্কা না করেই দৌড়ে গেল, “এসবের মানে কী তন্ময়? এক বাচ্চার বাবা তুই, কোনো খোঁজ নেই খবর নেই, এই বয়সে একটা মেয়েকে তুই লাভ লেটার লিখছিস? আর ওকে দিয়ে পাঠাচ্ছিস?”


তন্ময় হকচকিয়ে গিয়ে প্রথমে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল, “আপনি… মানে তুই? তি-তিতলি?”


চশমাটা একবার খুলে চোখ মোছার ব্যর্থ চেষ্টা করল তন্ময়, কিন্তু ওর দৃষ্টি তিতলির মুখ থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরছিল না। যেন ও ভয়ে আছে যে, পলক ফেললেই এই মরীচিকা মিলিয়ে যাবে।


তন্ময়ের গলার স্বর কেঁপে গেল, “তুই এখানে? কবে এলি? আর তুই... তুই কিসের চিঠির কথা বলছিস?”


ওরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বাচ্চা মেয়েটা তিতলির দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমিই তিতলি তো, আন্টি?”


তিতলি চমকে উঠল, “তুমি আমার নাম জানো?”


“বাবা বলে তুমি নাকি গল্পে থাকো? তোমাকে নিয়ে বাবা কত কী লিখেছে জানো? তোমায় কত ভালোবাসে, যেমন আমি ভালোবাসি। আমি তো লিখতে পারি না অত, তাই বাবার চিঠিগুলো তোমায় দিলাম।”


তন্ময় কিছুই বুঝতে পারছিল না, “আরে কিসের চিঠি?”


তিতলি বলল, “হ্যাঁ তোমার মেয়ে। কতখানি সাংঘাতিক নিজেই দেখ। আর তুই আমাকে নিয়ে এসব লিখতিস? মুখে বলতে পারিসনি কেন?”


“সর্বনাশ! তুই ওগুলো পেলি কীভাবে? আমি তো ভেবেছিলাম… অ্যাই তিতলি, কী করেছিস এসব তুই? তোমাকে না বারণ করেছি, আমায় না জিজ্ঞেস করে…”


তিতলি আবার চমকাল, “ওর নাম তিতলি? তুই রেখেছিস?”


তন্ময় মাথা নিচু করে বলল, “হ্যাঁ আমিই… চল না, কোথায় বসে কথা বলি। তাড়া নেই তো?”


একটা ছিমছাম কফিশপে ওরা তিনজন বসল। বাচ্চা মেয়েটা টিস্যু পেপারে প্রজাপতি আঁকছে, হাতে ক্রেয়ন।

তন্ময় ধীরে বলল, “আমি ওগুলো লিখেছিলাম, বহু বছর আগে। তুই চলে যাওয়ার পর। তোকে বলতাম আমি… তুই এমনভাবে না জানিয়ে চলে গেলি।”


বাইরের আলো ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছে। তিতলির বুকের মধ্যে কেমন যেন চাপা সুর বাজছে— একটা এমন যোগসূত্রের সুর, যেটার কোনো যুক্তি নেই।


তিতলি কিচ্ছু বলছে না দেখে তন্ময় আবার বলে, “সরি তিতলি। কিছু মনে করিস না। বাচ্চা মেয়ে, না বুঝে…”


“হুম!” ছোট্ট তিতলি সগর্বে বলল, “বাবার আলমারিতে অনেক পুরোনো সুন্দর চিঠি ছিল, আমি পড়তাম। ভাবতাম, এই চিঠিগুলো কারও জন্য লেখা। একদিন ভাবলাম, এগুলো পৌঁছে দিই— তোমার নাম দেওয়া আছে মানে এগুলো তো তোমারই।”


তন্ময় চোখ পাকাল, “আবার! খুব বকব কিন্তু।”


তিতলি নিঃশব্দে চোখ মুছল। বলল, “তুই আমায় চিনলি কী করে?”


ছোট্ট তিতলি হেসে বলল, “চিনব না? বাবার কাছে তোমার একটা পুরোনো ছবি আছে তো। আমি রোজ দেখি। ভ্যানে যেতে যেতে তোমাকেও দেখি ওই বারান্দায়— চোখদুটো একদম ছবির মতোই!”


“ভারি বুদ্ধি তো তোর! ঠিক যে সময়টা আমি মর্নিং ওয়াকে বেরোই, তাল বুঝে চিঠিটা ফেলে দিস, তাই তো?”


তিতলি হাসল, “হ্যাঁ তো।”


“হ্যাঁ রে তন্ময়, এগুলো কী পাগলামি বলত? যাকে ভালোবাসলি তাকে পেলি না, তাই বলে বিয়েও করলি না। একা একা সারা জীবন…”


তন্ময় হাসল, “একা কোথায় রে? এই বিচ্ছু মেয়েকে নিয়েই আমি পাগল হয়ে যাই। তাছাড়া আমি তোকে অনেক খুঁজেছিলাম। তোদের বাড়িওয়ালা বর্ধমানের ঠিকানা দিয়েছিলেন, আমি গিয়েওছিলাম। কাকিমার সাথে দেখাও হয়েছিল। তখন তুই দেশের বাইরে। এখন তোর হাজব্যান্ড এখানে তো?”


তিতলি সবটা জানাল তন্ময়কে। হালকাই লাগল অনেকটা।


“আচ্ছা, মা কেমন আছে রে? কেমন দেখলি?”


“সন্তানকে না দেখলে কোন্‌ মা ভালো থাকে বলতো? আর লুকোস না, বলে দিস। অন্য কারোর থেকে শুনলে ওনার মনে আঘাত লাগবে।”


তিতলি সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে। বলে, “এত সুন্দর একটা মিষ্টি মেয়ে তোর! তুই ওকে নিয়ে নিলি, না হলে আজ ও আমার হতো। ওকে ঠিক করে মানুষ করছিস তো?”


“দ্যাখ আর যা-ই দিই, মায়ের আদর দিতে পারব না। ওর কাছে আমি কিছু লুকোইনি, তোর গল্প বললেই ও মন দিয়ে শোনে। কী আশ্চর্য দেখ, তোকে মা অবধি ভেবে ফেলেছে! কী জানিস, বাচ্চা বলেই হয়তো ওরা এত নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারে।”


“আচ্ছা তন্ময়, আমার বাবা কী বলত তুই কী করে জানলি?”


বিজয়ায় একবার কাকুকে প্রণাম করেছিলাম, “মনে পড়ে? তোর ধুম জ্বর। আমার মাথায় হাত রেখে উনি আশীর্বাদ করেছিলেন, মন থেকে কোনো কিছু চাইলে একদিন ঠিক পাওয়া যায়।”


“ভালো করে ভেবে নে তন্ময়। আমি কিন্তু কোনোদিন কারোর জন্মদাত্রী মা হতে পারব না।”


তন্ময় তিতলির হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, “কথাটা শুধু ‘মা।’ আগেও কিছু নেই, পরেও কিছু থাকতে নেই।”


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page