নবরূপে নবদুর্গা | বনেদি বাড়ির পুজোর ভোগ | পুজোর সাজে টাচ-আপ | রবিবারের গল্প: ফক্কা

নবরাত্রির নয় রাত, নবদুর্গার নয় রূপ..
শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। কোথাও কাশফুলের দোলা, কোথাও মন্দিরের উঠোনে ধূপের গন্ধ। বাঙালির কাছে এই সময় মানেই দুর্গাপুজো, ষষ্ঠীর বোধন থেকে দশমীর বিসর্জন, ঢাকের বাদ্যি থেকে সিঁদুরখেলা। কিন্তু বাংলার পুজোর পরিচিত ছবির বাইরেও ভারতজুড়ে দেবী আরাধনার রয়েছে আরও এক দীর্ঘ, গভীর ও বৈচিত্র্যময় পরম্পরা। সেখানে দুর্গা কেবল দশভূজা মহিষাসুরমর্দিনী নন। তিনি কখনও পর্বতের কন্যা, কখনও তপস্বিনী, কখনও শান্তির প্রতীক, কখনও অসুরবিনাশিনী, কখনও আবার সমস্ত সিদ্ধির আধার।
এই নয় রূপেই নবরাত্রির নয় রাত জুড়ে পূজিতা হন নবদুর্গা।
হিন্দু শাস্ত্রীয় পরম্পরায় দেবী দুর্গার নয়টি বিশেষ রূপকে একত্রে বলা হয় ‘নবদুর্গা’। নবরাত্রির প্রতিটি দিন দেবীর একটি নির্দিষ্ট রূপের আরাধনার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিটি রূপের আলাদা নাম, আলাদা প্রতীক, আলাদা বাহন এবং আলাদা ভাবনা রয়েছে। দেবীর এই নয় রূপ যেন নারীশক্তির নয়টি ভিন্ন প্রকাশ—সৃষ্টি থেকে সাধনা, শান্তি থেকে শক্তি, ভয় থেকে নির্ভয়তা এবং শেষ পর্যন্ত সিদ্ধিলাভের এক আধ্যাত্মিক যাত্রা।

নবরাত্রির প্রথম দিন পূজিতা হন দেবী শৈলপুত্রী। নামের মধ্যেই রয়েছে তাঁর পরিচয়। ‘শৈল’ অর্থ পর্বত এবং ‘পুত্রী’ অর্থ কন্যা। অর্থাৎ পর্বতের কন্যা। পুরাণের কাহিনিতে তিনি হিমালয়ের কন্যা পার্বতীর রূপ। সতীর দেহত্যাগের পর তিনি পুনরায় হিমালয়ের গৃহে জন্মগ্রহণ করেন এবং শৈলপুত্রী নামে পরিচিত হন।
দেবী শৈলপুত্রী দ্বিভুজা। এক হাতে পদ্ম, অন্য হাতে ত্রিশূল। মস্তকে অর্ধচন্দ্র। তাঁর বাহন বৃষ। এই রূপে দেবী একদিকে যেমন কোমল মাতৃসত্তার প্রতীক, অন্যদিকে তেমনই অটল শক্তির প্রতিমূর্তি। পর্বতের মতো দৃঢ়, অথচ পদ্মের মতো কোমল—শৈলপুত্রীর রূপে যেন প্রকৃতির দুই বিপরীত সত্তারই মিলন।
নবরাত্রির দ্বিতীয় দিন আসে সাধনার পালা। এই দিনে পূজিতা হন দেবী ব্রহ্মচারিণী। নামের মধ্যেই রয়েছে তাঁর সাধনাময় চরিত্র। ব্রহ্মচর্য ব্রত অবলম্বনকারী দেবীই ব্রহ্মচারিণী। পুরাণকথায় তিনি সেই উমা, যিনি মহাদেবকে স্বামীরূপে লাভ করার জন্য কঠোর তপস্যা করেছিলেন।
দেবী ব্রহ্মচারিণীর রূপ শান্ত এবং জ্যোতির্ময়। তাঁর দুই হাতে জপমালা ও কমণ্ডলু। কোনও অস্ত্রের আড়ম্বর নেই, নেই ভয়ংকর সাজসজ্জা। আছে সংযম, ধৈর্য এবং একাগ্রতার প্রতীক। তাই নবরাত্রির দ্বিতীয় দিনটি যেন মনে করিয়ে দেয়—শক্তি শুধু অস্ত্র ধারণে নয়, নিজের মনকে জয় করার মধ্যেও নিহিত।
তৃতীয় দিনে দেবীর রূপ বদলে যায়। এবার তিনি চন্দ্রঘণ্টা। তাঁর কপালে ঘণ্টার মতো আকৃতির অর্ধচন্দ্র থেকেই এই নামের উৎপত্তি। দেবীর এই রূপে শান্তি এবং যুদ্ধ—দুই সত্তাই পাশাপাশি উপস্থিত। তিনি সিংহবাহিনী, দশভুজা এবং দশপ্রহরণধারিণী।
চন্দ্রঘণ্টার গাত্রবর্ণ সোনার মতো উজ্জ্বল। পরনে লাল বস্ত্র, শরীর অলংকারে সজ্জিত। তাঁর হাতে থাকে বিভিন্ন অস্ত্র। কিন্তু এই অস্ত্র কেবল ধ্বংসের প্রতীক নয়; অন্যায় ও অশুভের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসেরও প্রতীক। দেবীর কপালের ঘণ্টাধ্বনি যেন অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সতর্কতার আহ্বান।

চতুর্থ দিন পূজিতা হন দেবী কুষ্মাণ্ডা। নবদুর্গার মধ্যে এই রূপের সঙ্গে সৃষ্টি ও মহাজাগতিক শক্তির সম্পর্ক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বাস করা হয়, তাঁর হাসি থেকেই ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছিল। ‘কু’ অর্থ সামান্য, ‘উষ্মা’ অর্থ তাপ এবং ‘অণ্ড’ অর্থ ব্রহ্মাণ্ড—এই ব্যাখ্যা থেকেই কুষ্মাণ্ডা নামের অর্থকে বোঝানো হয়।
কুষ্মাণ্ডা অষ্টভুজা এবং সিংহবাহিনী। তাঁর আট হাতে থাকে বিভিন্ন অস্ত্র ও পবিত্র সামগ্রী—পদ্ম, ধনুক, বাণ, কমণ্ডলু, চক্র, গদা, অমৃতপূর্ণ কলস এবং জপমালা। তাঁর রূপের মধ্যে একদিকে রয়েছে সৃষ্টিশক্তি, অন্যদিকে রয়েছে সেই সৃষ্টিকে রক্ষা করার ক্ষমতা।
নবরাত্রির পঞ্চম দিনে মাতৃত্বের এক অপূর্ব রূপে আবির্ভূতা হন দেবী স্কন্দমাতা। কার্তিকেয় বা স্কন্দের মা বলেই তাঁর নাম স্কন্দমাতা। এই রূপে দেবীকে দেখা যায় কোলে সন্তানকে ধারণ করে থাকতে। মাতৃত্ব এখানে কেবল স্নেহের প্রতীক নয়, সন্তানের সুরক্ষা এবং শক্তিরও প্রতীক।
স্কন্দমাতা চতুর্ভুজা। উপরের দুই হাতে পদ্ম, একটি হাতে শিশু স্কন্দ এবং অন্য হাতে বরমুদ্রা। তিনি সিংহের উপর উপবিষ্ট এবং পদ্মাসনেও তাঁকে কল্পনা করা হয়। তাঁর এই রূপ যেন বলে—যে হাত সন্তানকে আগলে রাখে, প্রয়োজন হলে সেই হাতই হয়ে উঠতে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী আশ্রয়।
ষষ্ঠ দিনে পূজিতা হন দেবী কাত্যায়নী। এই রূপের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঋষি কাত্যায়নের তপস্যার কাহিনি। কথিত আছে, দেবী দুর্গাকে কন্যারূপে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ঋষি কাত্যায়ন কঠোর সাধনা করেছিলেন। তাঁর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী কাত্যায়নের কন্যারূপে আবির্ভূতা হন। তাই তাঁর নাম হয় কাত্যায়নী।
কাত্যায়নী সিংহবাহিনী এবং চতুর্ভুজা। তাঁর দুই হাতে বর ও অভয়মুদ্রা, অন্য দুই হাতে পদ্ম ও খড়্গ। কোথাও তাঁকে মহিষাসুরমর্দিনী রূপে, কোথাও আবার অষ্টাদশভুজা রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। দেবীর এই রূপ মূলত অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় ও শক্তির বিজয়ের প্রতীক।

নবরাত্রির সপ্তম দিন। দেবীর রূপ এবার আরও ভয়ংকর। তিনি কালরাত্রি।
নাম শুনলেই যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে অন্ধকারের এক তীব্র ছবি। দেবীর গাত্রবর্ণ ঘন কালো, চুল এলোমেলো, তিনটি চোখ, গলায় বজ্রের মতো দীপ্ত অলংকার। তাঁর বাহন গর্দভ। চতুর্ভুজা কালরাত্রির হাতে থাকে খড়্গ ও লৌহাস্ত্র; অন্য দুই হাতে বর ও অভয়মুদ্রা।
ভয়ংকর তাঁর চেহারা, কিন্তু তাঁর অন্তর্নিহিত সত্তা শুভ। তাই কালরাত্রির আর এক নাম শুভঙ্করী। তিনি অশুভের বিনাশ করেন, ভয় দূর করেন এবং ভক্তকে অভয় দেন। এই দ্বৈততাই কালরাত্রির রূপকে এত তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। জীবনের সমস্ত অন্ধকারের মধ্যেও যে শুভ শক্তি লুকিয়ে থাকে, কালরাত্রি যেন তারই প্রতীক।
নবরাত্রির অষ্টম দিনে দেবীর রূপ সম্পূর্ণ বিপরীত। সপ্তমীর কালো অন্ধকার পেরিয়ে অষ্টমীতে আবির্ভূতা হন শুভ্র, শান্ত, নির্মল মহাগৌরী।
মহাদেব-পত্নী এই দেবীর গাত্রবর্ণ শ্বেত, পরনেও শ্বেতবস্ত্র। তিনি বৃষভবাহনা এবং চতুর্ভুজা। তাঁর হাতে ত্রিশূল ও ডমরু, অন্য দুই হাতে বর ও অভয়মুদ্রা। তাঁর অলংকারেও রয়েছে শুভ্রতার ছোঁয়া।
মহাগৌরীর রূপকে শুদ্ধতা, শান্তি এবং পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। দীর্ঘ সাধনা ও তপস্যার পর দেবীর এই শুভ্র রূপ প্রকাশিত হয়েছিল বলে পুরাণকথায় নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। কালরাত্রির পর মহাগৌরীর আবির্ভাব যেন জীবনের অন্ধকার পেরিয়ে আলোর দিকে ফিরে আসার এক চিত্রকল্প।
আর তারপর আসে নবরাত্রির শেষ দিন—নবমী। দেবীর নবম এবং শেষ রূপ সিদ্ধিদাত্রী।
নামেই রয়েছে তাঁর মাহাত্ম্য। ‘সিদ্ধি’ অর্থ অর্জন বা সাফল্য এবং ‘দাত্রী’ অর্থ যিনি প্রদান করেন। অর্থাৎ যিনি সিদ্ধি প্রদান করেন, তিনিই সিদ্ধিদাত্রী। নবরাত্রির নয় দিনের সাধনার শেষে এই দেবীর আরাধনার মধ্য দিয়েই সম্পূর্ণতা লাভ করে নবদুর্গার উপাসনা।
সিদ্ধিদাত্রীকে সাধারণত চতুর্ভুজা রূপে কল্পনা করা হয়। তাঁর হাতে থাকে শঙ্খ, চক্র, গদা এবং পদ্ম। তিনি পদ্মাসনে উপবিষ্টা এবং সিংহ তাঁর বাহন হিসেবে পরিচিত। দেবীর এই রূপে রয়েছে পূর্ণতা ও পরিণতির ভাব। দীর্ঘ সাধনা, আত্মসংযম এবং শক্তির আরাধনার শেষ পর্বে এসে ভক্ত যেন পৌঁছে যান সিদ্ধির দ্বারে।
নবরাত্রির নয়টি দিন তাই শুধু নয়টি দেবীর নাম স্মরণ করার দিন নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে মানুষের অন্তর্জগতেরও এক যাত্রাপথ। প্রথমে শৈলপুত্রীর মতো দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করা, তারপর ব্রহ্মচারিণীর মতো সাধনা ও সংযম, চন্দ্রঘণ্টার মতো সাহস, কুষ্মাণ্ডার মতো সৃষ্টিশক্তি, স্কন্দমাতার মতো মমতা, কাত্যায়নীর মতো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, কালরাত্রির মতো অন্ধকারকে জয় করা, মহাগৌরীর মতো শুদ্ধতার দিকে ফিরে আসা এবং শেষে সিদ্ধিদাত্রীর মাধ্যমে পূর্ণতার সন্ধান।
এই কারণেই নবদুর্গার আরাধনা কেবল দেবীর নয়টি মূর্তির পুজো নয়; এটি নারীশক্তির বহুমাত্রিক প্রকাশকে উপলব্ধি করারও এক প্রাচীন আধ্যাত্মিক পরম্পরা।

ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে নবরাত্রির আচার, রীতি ও উৎসবের ধরন আলাদা। কোথাও উপবাস, কোথাও গরবা ও ডান্ডিয়া, কোথাও কুমারী পুজো, কোথাও মন্দিরকেন্দ্রিক বিশেষ আরাধনা—উৎসবের বহিরঙ্গ বদলে যায় অঞ্চলভেদে। কিন্তু অন্তরের বিশ্বাসটি প্রায় একই—অশুভের উপর শুভের জয়, অন্ধকারের উপর আলোর জয় এবং দুর্বলতার উপর শক্তির জয়।
বাঙালির দুর্গাপুজোয় দেবী আসেন বাপের বাড়িতে। তাঁর সঙ্গে আসেন সন্তানরা। চার দিনের আনন্দ, আবেগ, উৎসব শেষে দশমীতে বিদায়। আবার ভারতের অন্য বহু অঞ্চলে নবরাত্রির নয় রাত ধরে দেবীর নয় রূপের আরাধনা চলে। দুই পরম্পরার ভাষা আলাদা হলেও কেন্দ্রে সেই একই আদ্যাশক্তি।
দেবী কখনও কন্যা, কখনও তপস্বিনী, কখনও যোদ্ধা, কখনও জননী। কখনও তাঁর হাতে পদ্ম, কখনও ত্রিশূল। কখনও তিনি শান্ত, কখনও ভয়ংকর। কিন্তু প্রতিটি রূপের ভিতরেই রয়েছে এক গভীর বার্তা—শক্তির কোনও একটি মাত্র মুখ নেই।
তাই নবরাত্রির নয় রাত আসলে নয়টি আলোর প্রদীপ। প্রতিটি প্রদীপে দেবীর এক একটি রূপ, এক একটি শক্তি, এক একটি জীবনদর্শন। আর নবমীর শেষে যখন সিদ্ধিদাত্রীর আরাধনায় সেই প্রদীপগুলি যেন একসঙ্গে জ্বলে ওঠে, তখন নবদুর্গার পূর্ণাঙ্গ ছবি আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়।
সেই ছবিতে দেবী শুধু মন্দিরের বেদিতে নন। তিনি আছেন সৃষ্টিতে, সাধনায়, সাহসে, মাতৃত্বে, প্রতিবাদে, অন্ধকার জয় করার শক্তিতে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের ভিতরের পূর্ণতাকে খুঁজে পাওয়ার যাত্রায়। নবরাত্রির তাই প্রকৃত অর্থ শুধু নয় রাতের উৎসব নয়—নিজের ভিতরের শক্তিকে চিনে নেওয়ার নয়টি সুযোগ।

বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর ভোগ: কোথাও পোড়া মাছ, কোথাও
নিরামিষে জমে ওঠে দেবীর ভোগের থালা..
দুর্গাপুজো মানেই শুধু ঢাকের বাদ্যি, ধূপের গন্ধ, কাশফুল আর নতুন জামাকাপড় নয়। বাঙালির দুর্গাপুজো আসলে এক বিশাল সাংস্কৃতিক স্মৃতি। সেই স্মৃতির ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে রয়েছে কত পরিবার, কত প্রাচীন রীতি, কত গল্প এবং অবশ্যই কত রকমের রান্না। কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোয় সেই ঐতিহ্য যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একই শহরে, একই দেবীর আরাধনা, অথচ বাড়ি বদলালেই বদলে যায় পুজোর নিয়ম, বদলে যায় নৈবেদ্য, বদলে যায় ভোগের পদ।
কোথাও দেবীকে নিবেদন করা হয় মাছ পোড়া, কোথাও আবার পেঁয়াজ-রসুন তো দূরের কথা, অন্নভোগই নিষিদ্ধ। কোনও বাড়িতে ভোগের মূল আকর্ষণ লুচি ও নানা ধরনের তরকারি, কোথাও আবার বাড়িতে তৈরি মিষ্টির সম্ভারেই পূর্ণ হয় দেবীর ভোগের থালা। কোথাও শুকনো মুগডালের খিচুড়ি, কোথাও পাটপাতা দিয়ে শুক্তো। আবার কোনও বাড়িতে দেবীর জন্য রান্না হওয়া খাবারে নুন পর্যন্ত দেওয়া হয় না।
এই বৈচিত্র্যই কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোর অন্যতম আকর্ষণ। কারণ এই ভোগ শুধু খাবার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবারের বিশ্বাস, আচার, রুচি, ইতিহাস এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা স্মৃতি।

সাবর্ণ রায়চৌধুরী বাড়ি: ভোগের পাতে মাছ পোড়া
কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাস বলতে গেলে বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের কথা প্রথম সারিতেই আসে। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে এই পরিবারেই কলকাতার প্রাচীনতম দুর্গাপুজোগুলির অন্যতম সূচনা হয়। সেই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু পুরনো আচার ও ঐতিহ্য।
একসময় এই পুজোয় পাঁঠা ও মহিষ বলির রীতিও ছিল। সময়ের সঙ্গে অনেক রীতি বদলেছে। মহিষবলি এখন বন্ধ। কিন্তু ভোগের ক্ষেত্রে পরিবারের ঐতিহ্যের ছাপ এখনও স্পষ্ট।
এখানে দেবীকে আমিষ ভোগ নিবেদনের রীতি রয়েছে। ফল, মিষ্টি, লুচি, তরকারি, খিচুড়ি, ভাত ও পোলাওয়ের সঙ্গে থাকে ল্যাটা মাছ পোড়া। বাঙালির ঘরোয়া রান্নার সঙ্গে রাজপরিবারের পুজোর আচার যেন মিশে যায় এই পদে।
দশমীর ভোগেও রয়েছে আলাদা ঐতিহ্য। সেদিন দেবীকে নিবেদন করা হয় পান্তাভাত ও কচুশাক। বিসর্জনের আগে এই সরল খাবারের উপস্থিতি যেন পুজোর জাঁকজমকের মধ্যেও বাঙালির মাটির কাছাকাছি থাকার কথা মনে করিয়ে দেয়।
শোভাবাজার রাজবাড়ি: অন্নভোগ নয়, মিষ্টির রাজত্ব
কলকাতার বনেদি পুজোর কথা উঠলে শোভাবাজার রাজবাড়ির নাম অনিবার্য। ১৭৯০ সালে এই বাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা। রাজবাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কলকাতার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বিস্তর গল্প।
কিন্তু এই পুজোর ভোগের বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। এখানে দেবীকে অন্নভোগ দেওয়া হয় না। বরং বাড়িতে তৈরি নানা ধরনের মিষ্টি ও মিষ্টিজাতীয় খাবারেই সাজে দেবীর নৈবেদ্য।
গজা, চৌকো গজা, জিভে গজা, পান্তুয়া, খাস্তা কচুরি, সিঙারা, জিলিপি, নিমকি, রাধাবল্লভী—এক কথায় মিষ্টি ও জলখাবারের এক বিপুল আয়োজন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পুজোর সময় রাজবাড়িতে বিশেষ প্রস্তুতকারকদের হাতে তৈরি হয় এইসব পদ।

এই ভোগের দিকে তাকালে বোঝা যায়, বাংলার মিষ্টির ইতিহাসের সঙ্গেও বনেদি বাড়ির পুজোর কত গভীর সম্পর্ক। আজকের দিনে যখন মিষ্টি দোকানের কাউন্টার থেকে সহজেই পছন্দের মিষ্টি কেনা যায়, তখন বাড়ির পুজোর জন্য বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি হওয়া এই মিষ্টিগুলি যেন পুরনো কলকাতার স্বাদকে ধরে রেখেছে।
ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাড়ি: নুনহীন ভোগের অনন্য ঐতিহ্য
কলকাতার আর এক বিখ্যাত বনেদি পুজো ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাড়ির। ১৭৮০ সালে ঈশ্বরচন্দ্র রামদুলাল দে এই পুজোর সূচনা করেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে তাঁর দুই ছেলে আশুতোষ ও প্রমথ, অর্থাৎ ছাতুবাবু ও লাটুবাবুর আমলে এই পুজো বিশেষ জাঁকজমক লাভ করে।
এই বাড়ির ভোগেও রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। ঘিয়ে ভাজা লুচির সঙ্গে থাকে ছানা, ধোঁকা, স্টাফ ক্যাপসিকাম, ফুলকপির তরকারি। কিন্তু এই ভোগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল—মায়ের ভোগে নুন দেওয়া হয় না।
বাঙালির রান্নায় নুন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ দেবীর ভোগে নুনের অনুপস্থিতি এখানে একটি প্রাচীন আচার। খাবারের স্বাদ তাই নির্ভর করে ঘি, মশলা, সবজি ও রান্নার নিজস্ব স্বাদের উপর।
নৈবেদ্যে থাকে চাল, ফল, মিষ্টি ও দই। অর্থাৎ ভোগের থালা একই সঙ্গে সরল, ঐতিহ্যবাহী এবং স্বাদের দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়ি: বৈষ্ণব রীতির নিরামিষ নৈবেদ্য
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোর বৈচিত্র্য বোঝার জন্য জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়ির পুজোও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারটি অব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণব হওয়ায় এখানে পশুবলির রীতি নেই। অন্নভোগও দেওয়া হয় না।
নৈবেদ্যের মূল উপাদান চাল, ডাল, নানা ধরনের ফল ও মিষ্টি। এর সঙ্গে থাকে লুচি, গজা, খাজা, দই, নাড়ু ও মুড়কি। আরও থাকে চন্দ্রপুলি, বিভিন্ন ধরনের ক্ষীরের মিষ্টি এবং রাবড়ি।
অর্থাৎ অন্নভোগ না থাকলেও নৈবেদ্যের বৈচিত্র্যে কোনও ঘাটতি নেই। বরং বাংলার মিষ্টি ও বৈষ্ণব রন্ধন ঐতিহ্যের নানা পরিচিত পদ এখানে একত্রিত হয়।

এই বাড়িকে ঘিরে একটি জনপ্রিয় লোককথাও প্রচলিত—মা দুর্গা নাকি এখানে এসে গয়না পরেন। কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোর ক্ষেত্রে এমন লোকবিশ্বাসই উৎসবকে শুধু ধর্মীয় আচার না রেখে একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক গল্পে পরিণত করেছে।
কুমোরটুলির অভয়চরণ মিত্র বাড়ি: শুকনো মুগডালের খিচুড়ি
কথিত আছে, মা নাকি জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়িতে এসে গয়না পরেন, কুমোরটুলির অভয়চরণ মিত্র বাড়িতে ভোজন করেন এবং শোভাবাজার রাজবাড়িতে নাচ দেখেন। লোককথা কতটা ইতিহাস, কতটা বিশ্বাস—তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু এই গল্পগুলিই বনেদি পুজোর আকর্ষণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
অভয়চরণ মিত্র বাড়ির ভোগের অন্যতম বিশেষত্ব হল শুকনো মুগডাল দিয়ে তৈরি খিচুড়ি। রোদে শুকিয়ে নেওয়া মুগডালের নিজস্ব গন্ধ ও স্বাদ খিচুড়িতে আলাদা মাত্রা যোগ করে।
এর সঙ্গে থাকে বিভিন্ন ধরনের ভাজা, সবজি, তরকারি এবং খাঁটি মাখনের নৈবেদ্য। থাকে লুচি ও নানা রকম মিষ্টিও।
একটি ভোগের থালার মধ্যে দিয়ে এখানে যেন বাংলার পুরনো রান্নাঘরের ছবি ফুটে ওঠে। মাটির হাঁড়ি, রোদে শুকোনো ডাল, ঘি-মাখনের গন্ধ আর উৎসবের রান্না—সব মিলিয়ে ভোগ হয়ে ওঠে স্মৃতিরও এক অংশ।
চোরবাগান শীল বাড়ি: নিরামিষ শুক্তোয় পাটপাতার স্বাদ
উত্তর কলকাতার চোরবাগান শীল বাড়ির দুর্গাপুজোয় বৈষ্ণব মতে নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হয়। ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত দেবীর ভোগে থাকে লুচি, বিভিন্ন ধরনের ফল ও মিষ্টি।
তবে এই বাড়ির রান্নার অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল নিরামিষ শুক্তোয় পাটপাতার ব্যবহার। আজকের শহুরে রান্নাঘরে পাটপাতা খুব পরিচিত উপাদান নয়। কিন্তু বাংলার পুরনো রান্নায় শাকপাতার ব্যবহারের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।
পাটপাতা দিয়ে শুক্তো তাই শুধু একটি রান্নার পদ নয়, বরং হারিয়ে যেতে বসা আঞ্চলিক রন্ধনপ্রথার একটি স্মারকও বলা যায়।

ভোগের বৈচিত্র্য আসলে বাংলার বৈচিত্র্য
কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর ভোগের তালিকা দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—দেবী এক হলেও তাঁকে নিবেদনের রীতি এক নয়।
কোথাও মাছ পোড়া, কোথাও পান্তাভাত। কোথাও লুচি-তরকারি, কোথাও মিষ্টির পাহাড়। কোথাও খিচুড়ি, কোথাও অন্নভোগই নেই। কোথাও আবার রান্নায় নুন পর্যন্ত নিষিদ্ধ।
এই পার্থক্যের পিছনে রয়েছে পরিবারের ধর্মীয় বিশ্বাস, কুলাচার, পূর্বপুরুষের নির্দিষ্ট রীতি এবং স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি। তাই একটি বনেদি বাড়ির পুজোর ভোগকে অন্য একটি বাড়ির ভোগের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায় না। প্রত্যেকটির নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে।
আর এই ইতিহাসের একটা বড় অংশ রান্নাঘরে তৈরি হয়।
বাঙালির উৎসবের সঙ্গে রান্নাঘরের সম্পর্ক বরাবরই গভীর। দুর্গাপুজো তার সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলির একটি। দেবীর জন্য কী রান্না হবে, কোন পদ কখন নিবেদন করা হবে, কোন উপাদান ব্যবহার করা যাবে আর কোনটি যাবে না—এসব নিয়ম বহু পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে এসেছে।
আজকের প্রজন্মের অনেকেই হয়তো সেই রান্নার সমস্ত পদ্ধতি জানেন না। তবু পুজো এলেই বাড়ির বয়স্করা মনে করিয়ে দেন—“এই পদটা কিন্তু আমাদের বাড়ির পুজোর জন্য হয়”, “এই রান্নায় নুন দেওয়া যাবে না”, “এই ভোগটা দশমীতেই হয়।”
এইভাবেই খাবার হয়ে ওঠে পারিবারিক স্মৃতির বাহক।

ভোগের থালায় পুরনো কলকাতার ছবি
কলকাতা বদলেছে। বনেদি বাড়ির অনেক আঙিনা ছোট হয়েছে, বহু পুরনো বাড়ি হারিয়েছে তাদের আগের জৌলুস। কিন্তু দুর্গাপুজোর সময় সেই বাড়িগুলির অনেকগুলিতেই ফিরে আসে পুরনো দিনের আবহ।
ধূপের গন্ধের সঙ্গে মিশে যায় ঘিয়ে ভাজা লুচির গন্ধ। পুজোমণ্ডপের পাশে বসে তৈরি হয় খিচুড়ি। কোথাও মিষ্টির পসরা সাজানো হয়। কোথাও মাছ পোড়ার প্রস্তুতি চলে। কোনও বাড়িতে আবার ভোগের জন্য বিশেষভাবে ডাল শুকিয়ে রাখা হয় রোদে।
এইসব দৃশ্য আসলে কলকাতার খাদ্য-ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।
দুর্গাপুজোর ভোগ তাই শুধু দেবীর উদ্দেশে নিবেদন করা খাবার নয়। এটি একটি পরিবারের পরিচয়। একটি বাড়ির ইতিহাস। একটি সময়ের স্বাদ। এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে চলে আসা স্মৃতি।
আজ যখন কলকাতার পুজো ক্রমশ বড়, আরও ঝলমলে এবং আরও সর্বজনীন হয়ে উঠেছে, তখন বনেদি বাড়ির পুজোর ভোগ আমাদের অন্য এক কলকাতার কথা মনে করিয়ে দেয়—যে কলকাতায় উৎসব মানে ছিল বাড়ির উঠোন, নিজের হাতে রান্না, নির্দিষ্ট আচার, পারিবারিক মিলন এবং দেবীর জন্য যত্ন করে সাজানো একটি থালা।
সেই থালায় মাছ থাকুক কিংবা না থাকুক, অন্নভোগ থাকুক কিংবা না থাকুক, মিষ্টি থাকুক কিংবা শাকসবজি—প্রতিটি পদেই আসলে মিশে আছে বিশ্বাস আর ভালোবাসা।
তাই কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোয় ভোগের গল্প শুনতে গেলে শুধু খাবারের তালিকা শুনলে হবে না। পড়তে হবে সেই পরিবারের ইতিহাসও। কারণ সেই ইতিহাসেরই এক সুস্বাদু, ঘ্রাণময় এবং বহু প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকা অধ্যায় হল দেবীর ভোগ।

শহরের অলিগলি পেরিয়ে যখন ঢাক বাজে, ধূপ জ্বলে, উলুধ্বনি ওঠে, তখন কোথাও হয়তো ল্যাটা মাছ পোড়া তৈরি হচ্ছে, কোথাও ঘিয়ে লুচি ফুলছে, কোথাও শুকনো মুগডালের খিচুড়ির গন্ধ উঠছে, কোথাও আবার মিষ্টির থালা সাজানো হচ্ছে।
দেবী আসেন, পুজো হয়, ভোগ নিবেদন হয়। তারপর বছর ঘুরে আবার অপেক্ষা। কারণ বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোয় ভোগ শুধু দেবীর আহার নয়—এ যেন বাঙালির নিজের ঘরে ফিরে আসার স্বাদ।
পুজোর আগে ত্বকের যত্ন: ঘরোয়া ফেসপ্যাকে ফিরুক মুখের জেল্লা!
দুর্গাপুজো মানেই নতুন জামাকাপড়, শাড়ি, গয়না, সাজগোজ আর ছবি তোলার হিড়িক। ষষ্ঠী থেকে দশমী—কোনও দিনই যেন সাজের খামতি রাখা যায় না। কখনও অষ্টমীর অঞ্জলির ছবি, কখনও নবমীর রাতের সেলফি, আবার কখনও বন্ধুদের সঙ্গে প্যান্ডেল হপিংয়ের মুহূর্ত। ফলে পুজোর দিনগুলিতে নিজের ত্বকটাকেও একটু বাড়তি যত্নে রাখতে ইচ্ছে করে সকলেরই। কিন্তু তার জন্য যে সব সময় পার্লারে গিয়ে দামি ফেসিয়াল করাতেই হবে, এমন নয়।
পুজোর বেশ কিছুদিন আগে থেকেই যদি ত্বকের যত্নের একটি সহজ রুটিন তৈরি করা যায়, তাহলে ত্বক অনেক বেশি সতেজ ও পরিচ্ছন্ন দেখাতে পারে। ঘরোয়া উপাদান দিয়ে তৈরি কিছু ফেসপ্যাকও সেই রুটিনের অংশ হতে পারে। তবে মনে রাখা দরকার, ঘরোয়া উপাদান কোনও জাদুকাঠি নয়। এক রাতেই ত্বকের রং বদলে দেওয়া বা স্থায়ীভাবে দাগ মুছে ফেলার ক্ষমতা কোনও ফেসপ্যাকের নেই। বরং নিয়মিত পরিচর্যা, পর্যাপ্ত জল, ঘুম, সুষম খাবার এবং ত্বকের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত প্রসাধনী—সব মিলিয়েই তৈরি হয় সুস্থ ত্বক।
পুজোর আগে কেন শুরু করবেন ত্বকের যত্ন?
পুজোর ঠিক আগের দিন পার্লারে গিয়ে ফেসিয়াল করিয়ে নিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং ত্বকের যত্ন শুরু করা ভালো বেশ কিছুদিন আগে। কারণ ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় রাখা, অতিরিক্ত তৈলাক্ত ভাব নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা ত্বককে পরিষ্কার রাখার মতো বিষয়গুলি নিয়মিত পরিচর্যার সঙ্গে জড়িত।
বিশেষ করে যাঁদের ত্বক সংবেদনশীল, তাঁদের ক্ষেত্রে পুজোর ঠিক আগে নতুন কোনও প্রসাধনী বা ফেসিয়াল ব্যবহার করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত নয়। কোনও নতুন উপাদান ব্যবহার করতে চাইলে আগে ত্বকের ছোট অংশে পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো।

পুজোর আগে তাই একটি সহজ নিয়ম মেনে চলতে পারেন। সপ্তাহে এক দিন ফেসপ্যাক, প্রতিদিন মুখ পরিষ্কার করা, ত্বকের প্রয়োজন অনুযায়ী ময়শ্চারাইজার ব্যবহার এবং দিনে সানস্ক্রিন—এই কয়েকটি অভ্যাসই ত্বকের পরিচর্যার মূল ভিত্তি হতে পারে।
বেসন ও দুধের সরের ফেসপ্যাক
বাঙালি বাড়ির রূপচর্চায় বেসনের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। বহুদিন ধরেই ঘরোয়া পরিচর্যায় বেসন ব্যবহার করা হয়। এটি ত্বক পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহৃত একটি পরিচিত উপাদান। তবে মুখে লাগানোর সময় জোরে ঘষাঘষি করা উচিত নয়।
এই ফেসপ্যাক তৈরি করতে লাগবে বেসন, দুধের সর এবং সামান্য গোলাপ জল। দুই চামচ বেসনের সঙ্গে দুই চামচ দুধের সর মিশিয়ে নিন। প্রয়োজন হলে অল্প গোলাপ জল দিয়ে মিশ্রণটি নরম করে নিতে পারেন। খুব ঘন বা খুব পাতলা নয়—মুখে সহজে লাগানো যায় এমন একটি মিশ্রণ তৈরি করুন।
মুখ পরিষ্কার করে পাতলা করে ফেসপ্যাকটি লাগিয়ে রাখুন। প্রায় ১০ মিনিট পর স্বাভাবিক জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। শুকিয়ে যাওয়ার পরে শক্ত করে ঘষে তোলার চেষ্টা করবেন না। ধোয়ার সময় হাতের আঙুলের সাহায্যে খুব হালকা করে মিশ্রণটি সরিয়ে ফেলুন।
যাঁদের ত্বক খুব শুষ্ক বা সংবেদনশীল, তাঁরা এই ফেসপ্যাক ব্যবহার করার আগে অবশ্যই ছোট জায়গায় পরীক্ষা করে নিন। দুধের সর বা অন্য কোনও উপাদানে অ্যালার্জি থাকলে ব্যবহার না করাই ভালো।
মুলতানি মাটি ও চন্দন
তৈলাক্ত ত্বকের ক্ষেত্রে মুলতানি মাটি দীর্ঘদিন ধরেই ঘরোয়া রূপচর্চায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মুখের অতিরিক্ত তেলতেলে ভাব সাময়িকভাবে কমাতে এটি সাহায্য করতে পারে। চন্দনগুঁড়ো যোগ করলে তৈরি হয় আরও একটি পরিচিত ঘরোয়া ফেসপ্যাক।
পরিমাণ মতো মুলতানি মাটি ও সামান্য চন্দনগুঁড়ো নিয়ে তার সঙ্গে জল মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। চাইলে ত্বকের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত কোনও মৃদু উপাদান যোগ করা যেতে পারে, তবে একসঙ্গে অনেক কিছু মিশিয়ে ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই।

মুখে পাতলা করে লাগিয়ে প্রায় ১০ মিনিট রেখে দিন। একেবারে শক্ত হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করবেন না। ফেসপ্যাক শুকিয়ে টান ধরতে শুরু করলে জল দিয়ে ধীরে ধীরে ধুয়ে ফেলুন। পরে ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করুন।
তবে খুব শুষ্ক ত্বক হলে মুলতানি মাটি ব্যবহারে ত্বক আরও শুষ্ক লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে এই ফেসপ্যাক এড়িয়ে চলাই ভালো।
টক দই ও বেসন
টক দইয়ের মধ্যে থাকা ল্যাকটিক অ্যাসিড ত্বকের উপর হালকা এক্সফোলিয়েটিং প্রভাব ফেলতে পারে। সেই কারণেই ত্বকের পরিচর্যায় দইয়ের ব্যবহার প্রচলিত। তবে অ্যাসিডিক উপাদান বলে সবার ত্বকে এটি একই রকমভাবে মানাবে, এমন নয়।
একটি পরিষ্কার পাত্রে পরিমাণ মতো টক দই নিন। তার সঙ্গে সামান্য বেসন মেশান। চাইলে এক চিমটি হলুদ যোগ করতে পারেন। সবকিছু ভালোভাবে মিশিয়ে নরম পেস্ট তৈরি করুন।
মুখ ও গলায় পাতলা করে লাগিয়ে প্রায় ১০ মিনিট রাখুন। এরপর জল দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন। ফেসপ্যাক ব্যবহারের পর ত্বকে ময়শ্চারাইজার লাগাতে ভুলবেন না।
যাঁদের ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল, রোসেশিয়া, সক্রিয় ব্রণ, কাটা বা জ্বালাযুক্ত ত্বক রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ধরনের ঘরোয়া ফেসপ্যাক ব্যবহারের আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

ফেসপ্যাকের আগে ত্বক কীভাবে প্রস্তুত করবেন?
ফেসপ্যাক মুখে লাগানোর আগে মুখ পরিষ্কার থাকা জরুরি। বাইরে থেকে এসে মেকআপ, ধুলো বা সানস্ক্রিন না তুলে সরাসরি ফেসপ্যাক লাগানো উচিত নয়।
প্রথমে মৃদু ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে নিন। মুখ ধোয়ার পর নরম তোয়ালে দিয়ে আলতো করে শুকিয়ে নিন। ত্বকের প্রয়োজন হলে সপ্তাহে একবার খুব মৃদু এক্সফোলিয়েশন করা যেতে পারে। তবে প্রতিবার ফেসপ্যাক লাগানোর আগে স্ক্রাব করতেই হবে—এমন কোনও নিয়ম নেই।
বরং অতিরিক্ত স্ক্রাবিং ত্বকের স্বাভাবিক প্রতিরোধক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে দানা বা ব্রণ থাকলে মুখে জোরে ঘষাঘষি করা একেবারেই ঠিক নয়।
পরিষ্কার মুখে এবার ফেসপ্যাক লাগান। চোখ ও ঠোঁটের চারপাশ এড়িয়ে চলুন। ফেসপ্যাক শুকিয়ে গেলে টান দিয়ে বা ঘষে তোলার পরিবর্তে জল দিয়ে ধীরে ধীরে ধুয়ে ফেলুন।
সপ্তাহে এক দিনই যথেষ্ট?
ঘরোয়া ফেসপ্যাক প্রতিদিন ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। বরং অতিরিক্ত ব্যবহার করলে ত্বক শুষ্ক, সংবেদনশীল বা জ্বালাপোড়াযুক্ত হয়ে যেতে পারে।
পুজোর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে সপ্তাহে এক দিন ফেসপ্যাক ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্থাৎ পুজোর আগে আট সপ্তাহ সময় থাকলে সর্বোচ্চ আটবারের মতো ব্যবহার করার একটি সহজ রুটিন তৈরি করা যায়। তবে এটি কোনও বাধ্যতামূলক নিয়ম নয়। কারও ত্বক যদি কোনও ফেসপ্যাক সহ্য না করে, শুধু পুজো আসছে বলে সেটি ব্যবহার করে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
ত্বকের প্রতিক্রিয়াই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু ফেসপ্যাক নয়, সানস্ক্রিনও জরুরি
পুজোর সময় দিনের বেলায় প্যান্ডেল ঘোরা, অঞ্জলি দেওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে বেরোনো—সব মিলিয়ে রোদে থাকার সময় বেড়ে যায়। ফলে শুধু ফেসপ্যাক ব্যবহার করলেই ত্বকের যত্ন সম্পূর্ণ হয় না।
সকালে মুখ পরিষ্কার করার পরে ময়শ্চারাইজার এবং সানস্ক্রিন ব্যবহার করা জরুরি। বাইরে থাকলে দীর্ঘ সময় পরে সানস্ক্রিন পুনরায় ব্যবহার করার প্রয়োজন হতে পারে। ছাতা, টুপি বা ওড়না দিয়েও সরাসরি রোদ থেকে ত্বককে সুরক্ষিত রাখা যায়।
মনে রাখতে হবে, ত্বকের জেল্লা শুধু কোনও ফেসপ্যাকের উপর নির্ভর করে না। দীর্ঘ সময় রোদে থাকা, ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ, ধূমপান, অপর্যাপ্ত জল পান এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসও ত্বকের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
পুজোর আগে খাবারেও থাকুক নজর
ত্বকের যত্ন শুধু বাইরে থেকে করা যায় না। প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গেও ত্বকের স্বাস্থ্যের সম্পর্ক রয়েছে। পুজোর আগে দ্রুত ওজন কমানোর জন্য না খেয়ে থাকা বা অত্যন্ত কড়া ডায়েট শুরু করা বরং শরীর ও ত্বকের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
পর্যাপ্ত জল পান করুন। খাদ্যতালিকায় রাখুন শাকসবজি, ফল, ডাল, ডিম, মাছ, বাদাম ও বীজের মতো পুষ্টিকর খাবার। অতিরিক্ত চিনি, ভাজাভুজি বা অত্যন্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস কমানো ভালো।
পুজোর কয়েকদিন আগে থেকেই শুধু ত্বক ভালো রাখার জন্য কোনও একটি খাবার অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়ারও প্রয়োজন নেই। ভারসাম্যপূর্ণ খাবারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ঘুমের অভাবেও ম্লান দেখাতে পারে ত্বক
পুজোর আগেই শুরু হয়ে যায় রাত জাগা। কেনাকাটা, কাজের চাপ, বাড়ির প্রস্তুতি, অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে ঘুমের সময় কমে যেতে পারে। কিন্তু ত্বকের স্বাভাবিক সতেজতার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই পুজোর আগে যতটা সম্ভব নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস তৈরি করুন। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমোতে যাওয়ার চেষ্টা করুন। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে মুখের মেকআপ ও সানস্ক্রিন ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিন।
পুজোর ঠিক আগের রাতে কী করবেন?
পুজোর আগের রাতে নতুন কোনও ফেসপ্যাক বা প্রসাধনী ব্যবহার না করাই নিরাপদ। এতদিন যে ময়শ্চারাইজার, ক্লিনজার ও অন্যান্য পণ্য ব্যবহার করে ত্বক ভালো থেকেছে, সেগুলিই ব্যবহার করুন।
বিশেষ করে পার্লারে গিয়ে একেবারে নতুন কোনও ট্রিটমেন্ট করিয়ে পরদিন পুজোয় বেরিয়ে পড়া ঠিক নয়। কোনও কোনও ট্রিটমেন্টের পরে ত্বকে লালচে ভাব, শুষ্কতা বা সংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে।
তাই পুজোর আগের রাতের রূপচর্চা হওয়া উচিত যতটা সম্ভব সহজ। মুখ পরিষ্কার করুন, প্রয়োজন অনুযায়ী ময়শ্চারাইজার লাগান, ঠোঁটে লিপ বাম ব্যবহার করুন এবং পর্যাপ্ত ঘুমোন।
ঘরোয়া উপাদান মানেই যে সবার জন্য নিরাপদ, তা নয়
এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রান্নাঘরে থাকা কোনও উপাদান প্রাকৃতিক হলেই সেটি সবার ত্বকের জন্য নিরাপদ হবে—এমন নয়।
লেবুর রস, বেকিং সোডা, টুথপেস্টের মতো নানা উপাদান অনলাইনে ত্বকের জন্য ব্যবহারের পরামর্শ হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু ত্বকে এগুলি ব্যবহার করে জ্বালা বা প্রদাহ তৈরি হতে পারে। তাই এমন কোনও উপাদান ব্যবহার করা উচিত নয়, যার নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিত নন।
একইভাবে মধু, দুধ, দই, বেসন, চন্দন বা মুলতানি মাটিও সবার ত্বকে সমানভাবে মানাবে না। প্রথমবার ব্যবহার করার আগে ছোট জায়গায় পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো।

কখন ফেসপ্যাক নয়, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ দরকার?
মুখে হঠাৎ প্রচুর ব্রণ, চুলকানি, লালচে দাগ, ফুসকুড়ি, জ্বালা, ত্বক ফুলে যাওয়া বা কোনও পুরনো দাগের পরিবর্তন হলে ঘরোয়া ফেসপ্যাক দিয়ে সমস্যাটি ঢাকার চেষ্টা করা উচিত নয়।
ত্বকের কোনও নির্দিষ্ট সমস্যা থাকলে তার কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। তাই প্রয়োজনে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
পুজোর আগে ত্বক সুন্দর রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় আসলে কোনও একদিনের ফেসিয়াল নয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে নিয়মিত এবং মৃদু পরিচর্যা। পরিষ্কার ত্বক, প্রয়োজনমতো ময়শ্চারাইজার, নিয়মিত সানস্ক্রিন, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাবার এবং নিজের ত্বকের ধরন সম্পর্কে সচেতনতা—এই ছোট ছোট অভ্যাসই ধীরে ধীরে ত্বককে আরও সতেজ দেখাতে সাহায্য করতে পারে।
তাই পুজোর আগে আট সপ্তাহকে যদি ত্বকের যত্নের সময় হিসেবে ধরে নিতে চান, সপ্তাহে এক দিন একটি সহজ ফেসপ্যাক ব্যবহার করতে পারেন। কোনও সপ্তাহে সময় না পেলে দুশ্চিন্তারও কিছু নেই। কারণ সুন্দর ত্বকের জন্য সবচেয়ে জরুরি হল নিয়মিত যত্ন, অতিরিক্ত কিছু করার চেষ্টা নয়।
পুজোর সাজে মুখের স্বাভাবিক জেল্লাটাই থাকুক সবচেয়ে বড় অলংকার। আর সেই জেল্লার পিছনে থাকুক নিজের ত্বকের প্রতি একটু যত্ন, একটু সময় এবং অনেকটা সচেতনতা।

রবিবারের গল্প: ফক্কা
আনন্দরূপ দাস
ট্রেনটা লেট করতে করতে কোনও রকমে ভেদিয়া স্টেশনে এসে দাঁড়ালো। কথা ছিল বোলপুরে গিয়ে মধ্যাহ্নভোজন করব। সেটা বৈকালিক ভোজনের রূপান্তরিত হবে। জানলার রডে মাথা হেলিয়ে দিয়ে প্ল্যাটফর্মটার দিকে তাকিয়ে আছি। চৈত্রের শুকনো হাওয়া এসে লাগছে। কামরায় একটা বাউল উঠেছে—
“মিলন হবে কত দিনে আমার মনের মানুষেরও সনে”
এই পরিস্থিতিতে গানটা প্রাসঙ্গিক কিনা জানি না, তবুও আবেশে চোখ বুজে আসছে। হঠাৎ মোবাইলটা বেজে উঠল।
“স্যার আপনি কত দূরে স্যার?” দুর্গা ভট্টাচার্যের তোষামদি গলা।
“ভেদিয়া স্টেশনে।”
“ও ঠিক আছে ঠিক আছে স্যার, চিন্তার কিছু নেই, আর মাত্র ১৫ মিনিট। স্টেশনে ভৈরব নামে একটি ছেলেকে পাঠাবো, ও আপনাকে খুঁজে নেবে। আপনার নম্বরটা দিয়ে দিয়েছি স্যার ওকে।”
গাড়ি গড়াতে আরম্ভ করল। কোপাই নদীর উপর উঠে আবার গতি কমল। মনে হয় কোপাইয়ের রূপে মুগ্ধ হয়ে গেছে সে। ছোটবেলার কবিতা ‘আমাদের ছোট নদী’ অনেক কষ্টে শিষ্টে মনে করার চেষ্টা করছি। আবার মোবাইল ধরতে হলো।
“স্যার আমি ভৈরব বলছি। স্টেশনের প্রথম গেটের সামনেই আমি আছি।”
দুর্গা বাবু ভাল চেলা তৈরি করেছে। কথাবার্তায় ভট্টাচার্য বাবুর জেরক্স কপি।
---
স্টেশনের গেট দিয়ে বেরোতেই রিকশা, অটো, টোটো চালকরা তাদের সর্বোত্তম পরিষেবা দেওয়ার জন্য এগিয়ে এলো। তাদের সবিনয় আবেদন কে কেন আমি সসম্মানে এত প্রত্যাখ্যান করছি তার কারণটা বোঝার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। সেই সময়ে ২২-২৩ বছরের একটি যুবক আমার ব্যাগটা হাত থেকে নিয়ে বলল—

“স্যার আমি ভৈরব। দুর্গা বাবু আমাকে পাঠিয়েছেন।”
আমি কিছু বোঝার আগেই সে হনহন করে ব্যাগটা নিয়ে সামনের দিকে এগোতে থাকল। এখন আমার কাজ ওকে অনুসরণ করা। স্টেশন চত্বরের জিলিপির প্যাঁচ কাটিয়ে যখন ধাতস্থ হলাম তখন দেখি ভৈরব একটা টোটোর কাছে দাঁড়িয়ে। আমার স্থান পেছনের সিট। ও আমার সামনে উল্টো দিকে সিটে। ঘাড় ঘুরিয়ে নির্দেশ দিল—
“বিচিত্রা মোড়, ডানদিকের গলিটা দিয়ে একটু ঢুকবেন, পরিষদ ভবনের কাছে নামব।”
টোটো চলল বোলপুর বাজার দিয়ে। পড়ন্ত বেলায় মানুষের ব্যস্ততার তাড়া। অনেকক্ষণ এইভাবে চলার পর নীরবতা ভঙ্গ করলাম।
“তোমার পুরো নাম কী?”
“ভৈরব বীরবংশী স্যার।”
“তোমার ডাক নাম?”
এই প্রশ্নটা ভৈরবের কাছে বেশ অপ্রত্যাশিত। প্রশ্নটা ওকে বেশ ঝামেলায় ফেলেছে বোঝা গেল। একরাশ সরলতা ও তারুণ্যে ভরা হাসি ভৈরবের মুখে।
“আমাকে ফক্কা বলে ডাকবেন স্যার।”
“ফক্কা?”
অদ্ভুত নাম। প্রচণ্ড হাসি পেলেও অসীম চেষ্টায় সেটাকে বাস্তবায়িত হতে দিলাম না। বরঞ্চ একটু গম্ভীর ভাবে বললাম—
“শোনো ফক্কা, প্রতিটি কথা এরকম স্যার স্যার করবে না, মনে থাকবে তো।”
সারল্যের হাসি উপছে ওঠে কৃষ্ণবর্ণ সাঁওতাল ছেলেটির মুখে। আমার দৃষ্টি আটকায় এবার উপরের পাটিতে লুকিয়ে থাকা শুভ্র গজদন্তে।
শ্যামল সঘন নববরষার কিশোর দূত কি এলে। ওগো সাঁওতালি ছেলে।

---
কল্যাণ পরিষদের অফিসে পৌঁছে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। কাজ শেষ হতে হতে প্রায় সাড়ে সাতটা বেজে গেল। অফিসের পিছনে দোতলা গেস্ট হাউস। দুটো একই চত্বরের মধ্যে হলেও সামনের অফিসটা একটু বাংলো বাড়ির মত। দোতলার প্রথম ঘরটায় আমার থাকার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। ঘরটা দক্ষিণমুখী, পূর্বদিকটা খোলা, একটা আম গাছ আছে। সামনে টানা বারান্দা। চারপাশটা বেশ শান্ত। বারান্দার শ্বেত পাথরের গোল টেবিলে শিখাদি চা দিয়ে গেছে। শিখাদি সংস্থার সঙ্গে প্রায় জন্মলগ্ন থেকে যুক্ত। যত লোক আসে গেস্ট হাউসে সবাইকে নিজে হাতে রান্না করে খাওয়ায়। কাজের সূত্রে আমি আগে বহুবার এলেও রাত্রিবাস এই প্রথম। চারদিকে ঝিঁঝি পোকা ডাকছে। ব্যস্ততার কোনও চিহ্ন মাত্র নেই, সামনে পড়ে আছে অনন্ত সময়। একটা গারো নিস্তব্ধতা শান্তির বাতাবরণে নিঃশব্দে জাল বুনে চলেছে।
সময়ের সাথে সাথে সেই জাল বিস্তার করছে চারদিকে, অনেক কিছু অপেক্ষা করে আছে, তারা বলবে বলে দাঁড়িয়ে আছে চারিদিকে, কিন্তু কেউ শুনতে চায় না তাদের কথা। গেস্ট হাউসের ঘরের টিভি বড়ই যেন বেমানান।
কাপটা নিয়ে বারান্দায় রাখা আরাম কেদারার ওপর গিয়ে বসলাম। সামনে লন পেরিয়ে একটা গ্রিলের দরজা। তার উপর ছাতার মত মাধবীলতা। একটা হালকা মিষ্টি গন্ধ আসছে। ডানদিক ঘেঁষে রান্নাঘর, আলো জ্বলছে। রাতের খাবার তৈরি করছে শিখাদি। পরম স্নেহে, ভালোবাসায় সবাইকে আপন করে নেন এই ৬০ ঊর্ধ্ব এই প্রৌঢ়।
বারান্দা থেকে সদর পেরিয়ে সোজা রাস্তা চলে গেছে বিচিত্রা মোড়ের দিকে। রাস্তার কিছুটা অংশ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। বড় রাস্তায় জ্বলা আলো তির্যক পথ দিয়ে চোখে ধরা পড়ছে। সেখান থেকে উত্তরের রাস্তা দুটো ভাগে ভাগ হয়েছে। বাঁ দিক ঘেঁষে ১০ মিনিট হাঁটলেই গুরুদেবের আশ্রম, উপাসনা গৃহ, ছাতিমতলা।
“সদরের চাবিটা রেখে গেলাম।”
আচমকা শিখাদির গলাতে ঘোর কাটল। আঁচলে হাত মুছতে মুছতে গোলটেবিলের উপর রেখে দিল চাবিটা শিখাদি।
“ফক্কা একটু বাদেই আসবে, ওকে চাবিটা দিয়ে দেবেন। রান্নাঘরে আপনার খাবার চাপা আছে। ঠান্ডা হয়ে গেলে ওকে বলবেন গরম করে দিতে। আমি বেরিয়ে যাচ্ছি, আজ একটু মেয়ের বাড়ি যাব।”
“ঠিক আছে। অনেক সকালে তো আসেন। আজকে আবার আমার রান্নাবান্না করতে হলো।”
মুচকি হাসে শিখাদি।
“না না, সে তো প্রায়দিনই কেউ না কেউ আসে। এই তো গত পরশু ৩০ জন লোক ব্লক অফিস থেকে এসে রাতে থেকে গেল। ওসব আমার অভ্যাস আছে। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে প্রত্যেকদিন ৬০ জনের রান্না হতো। আমার রান্না করতে ভালই লাগে। আসলে মেয়ের বাচ্চাটার কাল থেকে খুব জ্বর এসেছে, আমায় বলেছিল আসতে, আমি সময় পাইনি।”
সাইকেলের আওয়াজ পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে নিচে তাকায় শিখাদি।
“ঐ তো ফক্কা এসে গেছে। আপনাকে আর নামতে হবে না, আমি চাবিটা দিয়ে দেবো।”
শিখাদি চলে যাওয়ার পর ঘরের লাইটটা অফ করে দিলাম। বারান্দায় রাখা চেয়ারে গা হেলিয়ে দিয়েছি। রাস্তার মৃদু আলো বারান্দায়। একতলার ঘরে ফক্কা আর শিখাদি কথা বলছে। নিচে একটু তাকাবার চেষ্টা করলাম, কাউকেই দেখতে পেলাম না। রাস্তার মৃদু আলোর ওপরে এক ফালি চাঁদ। ফক্কা কোলাপসিবল গেট টানছে। এবার নিজের জগতে যাবার পালা। নিস্তব্ধতার সঙ্গে সখ্যতা করেছি, এখন তাকে উপভোগ করার সময়। চেয়ারের ওপর চোখ বুজে বসে আছি। সচল দেহ নিশ্চল হচ্ছে। চোখের উপর দিয়ে ভেসে চলেছে রঙিন পর্দার ছায়াছবি। আস্তে আস্তে তারা চলে যাবার পর, শক্তিপুঞ্জ মূলাধারে। স্বাধিষ্ঠান অতিক্রম করে মণিপুরায়। নীরবতা আরো গভীর। চারপাশে ভিড় করে এসেছে তারা। বিক্ষিপ্ত ইড়া পিঙ্গলাকে স্থির করতে ব্যস্ত। মণিপুরা অতিক্রম করে অনাহতর দিকে অগ্রসর। হৃদপিণ্ডের আওয়াজ আর সাথে ঊর্ধ্বমুখী শক্তি তরঙ্গ। হঠাৎ ঊর্ধ্বমুখী গতি মন্থর হয়ে পড়ল। বাইরে থেকে তরঙ্গ আসছে। মিলতে চাইছে আপন তরঙ্গের সঙ্গে। দুটোর মধ্যে কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম মিল। তরঙ্গের ঢেউয়ের গতি বাড়ছে। মনের সঙ্গে সংযোগ ক্রমে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। তার চরণধ্বনি আমি হৃদয়ে গণি—'সে আসিবে' আমার মন বলে। বাধ হয়ে চোখ খুলতে হলো। শরীর তখনও নিশ্চল। স্থির চোখে দেখছি অদূরে এক ছায়ামূর্তি। চুপ করে দাঁড়িয়ে। অসারতার জাল ছিঁড়ে সজোরে মোবাইলের আলো ফেললাম তার দিকে।
“একি ফক্কা! এখানে চুপ করে দাঁড়িয়ে কেন?”
উত্তর দেয় না ফক্কা। নিশ্চল প্রস্তরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে শান্তভাবে মুখ খোলে ও—
“রাতের খাবারটা কি এখানে খাবেন না নিচে?”
চেয়ার থেকে উঠে আলো জ্বালালাম। একটু ফক্কাকে বিপদে ফেলার ইচ্ছে জাগল।
“আমি ওপরেই খাব কিন্তু তোমাকেও আমার সঙ্গে খেতে হবে।”
সেদিন অনেক রাত অব্দি আমরা গল্প করেছিলাম। তারই মাঝে ফক্কা ভেঙে দিয়েছিল আপনি-তুমির নড়বড়ে পাঁচিল। দাদা সম্বোধনটা ওর নিজের অভিধান থেকে বেরিয়েছিল আর বিদেশি সম্বোধনটা যে কোথায় ছিড়ে পড়েছিল তার খেয়াল আমরা দুজনেই রাখিনি সেদিন। মাস পাঁচ ছয় হলো এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ও। রাতে এখানেই থাকে একতলার ঘরে। বিশ্বভারতীর তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। দুপুরে কলেজ যায়, সন্ধের আগে এখানে চলে আসে। এখানেই পড়াশোনা করে নেয় আর সকালবেলায় খানিকটা কাজ করে বাড়ি চলে যায়।
পরদিন ঘুম ভাঙল এক দঙ্গল চড়াইয়ের ভুল বোঝাবুঝির আওয়াজে। ১০-১২টা চড়াই জানালাতে বসে কী প্রচণ্ডভাবে যে বাদানুবাদ করছিল তা বলার কথা নয়। তাদের বচসার কারণ অনুসন্ধানের ব্যর্থ প্রচেষ্টা না করে বিছানা থেকে সরাসরি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। কিছুটা দূরে দেখি একটা বারমুডা আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে সাইকেল চালিয়ে ফক্কা যাচ্ছে। সাইকেলের হ্যান্ডেলে একগাদা লেকার্না ফুল তুলে লাগিয়েছে।
“ফক্কা—এই ফক্কা কোথায় যাচ্ছ?”
চলন্ত সাইকেল থেকে বাঁ পা টা মাটিতে নামায়।
“খোয়াই নদীতে, মাছ আনতে, চলে এসো আমার সঙ্গে।”
আমি কালবিলম্ব না করে স্যান্ডেলটা পায়ে গলিয়ে সাইকেলের পেছনে গিয়ে বসলাম। শান্তিনিকেতন তখন পুরোপুরি জাগেনি। সকালের ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগছে। তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে লেকার্নার গন্ধ। আমার মনে লাগল বহু কালের পরিচিত কারো সঙ্গে আমি যাচ্ছি।
আজকে কাজের সূত্রে একটু ইলামবাজারের যাবার কথা। দশটার মধ্যে খোয়াই নদীর মাছ খেয়ে রওনা দিলাম। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে গেল। এসে দেখি শিখাদি ফক্কাকে সব দায়িত্ব দিয়ে তাড়াতাড়ি চলে গেছে। আমি ফ্রেশ হয়ে নিচে যাব বলে ঠিক করছি সেই সময় ফক্কা এক থালা মুড়ি নিয়ে উপরে উঠে এলো। নিচের সদরে তালা দিয়ে আমরা সোজা ছাদে গিয়ে বসলাম। মুড়ির সঙ্গে ডুমুর ভাজা আর তার সঙ্গে চা অভিনব খাবার, ফক্কা অবশ্য তার সঙ্গে একটু পেঁয়াজ লঙ্কা যোগ করেছিল। অনেকবার কল্যাণ পরিষদের অফিসে আসা সত্ত্বেও একবারও সময় করে উঠতে পারিনি শান্তিনিকেতনের আশ্রম যাওয়ার। প্রচুর কাজ নিয়ে এখানে আসা হয়, কাজ শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই ফেরার টিকিট রেডি করা থাকে। এত সব কথা শোনার পর ফক্কা বলে উঠল—
“এবার নিশ্চয়ই সময় করে এসেছ।”
“না রে, কালকেই চলে যেতে হবে।”
চলে যাবার কথা শুনি ফক্কার মন ভার হয়ে গেল।
“কালকে ট্রেন কি দুপুরে না বিকেল?”
“না না, দুপুরেই চলে যাব।”
চকিতে উত্তেজিত হয়ে উঠল ফক্কা। তারপর গম্ভীর হয়ে বলে উঠল—
“দাদা, কালকে কাকভোরে তৈরি হয়ে থেকো।”
পরের দিন ঠিক কাকভোরে আমার ঘুম ভেঙে গেল। ভোরের আলো কেমন হয় সেটা জানা নেই। গভীর রাত্রির ঠিক পরে হঠাৎই ভোরের স্নিগ্ধ আলো গোটা আকাশময়। দু-একটা পাখি ডাকছে মাঝে মাঝে। উঠে বসে ডানদিকের জানলাটা খুলে দিলাম। ঠান্ডা হাওয়া সারা ঘরময় পায়চারি করছে। চাদরটা জড়ালাম। একরাশ ভালোলাগা আমার চারপাশে। ক্লান্তিকে বাড়ি পাঠিয়েছে। ব্রাহ্ম মুহূর্ত। সকাল যে এত ভালো হয় আগে জানা ছিল না। চুপ করে খাটের উপর বসে আছি, আবার ধেয়ে আসছে অনাহতের কাছে এক তরঙ্গ।
দরজায় একটা ছোট্ট আওয়াজ। অন্যদিকে কেউ একজন দাঁড়িয়ে। চাদরটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে দরজার কাছে এগোচ্ছি। তখনও জানতাম না, অপর পারে এক ঝাঁক বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে।
সাদা চুড়িদার আর পাঞ্জাবি, অধোবধনে হাসি জড়িয়ে ফক্কা। স্নিগ্ধতার পরিমণ্ডলে ঢাকা আয়নীয় দেহ। জোর করে আচ্ছন্নতা কাটাই।
“কী সুন্দর লাগছে রে তোকে।”
স্বলজ্জ হাসির মধ্যে জড়িয়ে আছে সরলতা। গজদন্তের ক্ষণিক দর্শন সুন্দরকে আবার টেনে এনে বসায় চোখের সামনে।
হাঁটতে হাঁটতে দুজন গিয়ে পৌঁছেই উপাসনা গৃহে। ছাত্র-ছাত্রীরা সেখানে, ফক্কাকে অনেকেই চেনে। ঘণ্টার ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত আশ্রমের আবাসিক ছাত্র-ছাত্রীরা উপাসনা গৃহে সমবেত হল। সংস্কৃত মন্ত্র, গুরুদেবের রচনা ও সংগীতে ভরে উঠল উপাসনা গৃহ। ফক্কার তত্ত্বাবধানে সেদিন পুরো শান্তিনিকেতন আমি ঘুরে দেখলাম। আজকে চলে যাব তাই কোনও কাজ নেই অফিসে। ফিরতে ফিরতে প্রায় দশটা। চান-টান করে ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিয়েছি। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া করে বেরিয়ে পড়ব। দু-একবার মোবাইলে চেষ্টা করলাম ফক্কার সঙ্গে যোগাযোগ করার। মনে হয় কলেজ গেছে। আজ অফিস একদম ফাঁকা। দুর্গা বাবু আমার ফেরার টিকিটটা শিখাদির কাছে রেখে সিউড়িতে সরকারি প্রশিক্ষণ শিবিরে গেছে। ট্রেনের সময়ের বহু আগে বেরিয়ে পড়লাম। বিচিত্রা মোড় থেকে অটো ধরব। হঠাৎ আমার হাতের ব্যাগটা নিয়ে সাইকেলে ঝুলিয়ে নিল ফক্কা। আমাকে সাইকেলের পেছনে বসিয়ে মেঠো রাস্তা দিয়ে নেমে গেল। সাইকেলের সামনের হ্যান্ডেলে এক গোছা টাটকা লেকার্না ফুল। ১০-১২ মিনিট সাইকেল চালাবার পর পৌঁছলাম সাঁওতাল গ্রামের একটা বাড়িতে। বাড়ির সামনে আমাকে দাঁড় করিয়ে ফক্কা ভেতরে ঢুকল। সদর দরজার পর একটা বিরাট উঠোন। সুন্দর করে নিকানো। উঠোনের মাঝখানে একটা নিম গাছ। দরজার পাশে দেওয়ালগুলো মাটির, নিচের দিক থেকে কিছুটা উপরে লাল সাদা নকশা। ডুরে শাড়ি পরা এক মধ্যবয়স্কা মহিলা একহাতে মাটির গ্লাসে জল আর এক হাতে শালপাতায় কিছু গুড় এনে আমার মুখের সামনে ধরল। এত দ্রুত ঘটে যাওয়া ঘটনাতে নিজের অস্তিত্ব যথেষ্ট বেমানান। ফক্কার অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও বেশিক্ষণ আতিথেয়তা গ্রহণ করতে পারলাম না। ট্রেনের টাইম হয়ে আসছে। ফক্কা আবার আমায় সাইকেলে তুলেছে। এবার তার গতি দ্রুত। মেঠো রাস্তা দীর্ঘায়িত পথকে ক্রমশ কমিয়ে দিচ্ছে। কিছু পরে হাজির হলাম প্রহরীবিহীন এক লেভেল ক্রসিংয়ে। এখান থেকে বোলপুর স্টেশনটা সরাসরি দেখা যাচ্ছে। এরপর আমাকে রেললাইন ধরে এগোতে হবে। ফক্কার সঙ্গ এখানেই শেষ। সাইকেল থেকে নেমে ফক্কার দিকে তাকালাম। ওর দৃষ্টি অন্যদিকে। সংযমের বাঁধ না ভাঙার সংকল্পকে অটুট রাখার চেষ্টায় ব্যস্ত তখন ও। আলতো করে পিঠে হাত রাখলাম।
“মন খারাপের কী আছে, আমি তো আবার আসব।”
কোথা থেকে এক অজানা আতঙ্ক আমার সারা দেহকে কাঁপিয়ে দিল। পাশের লাইন দিয়ে দ্রুত গতিতে ডাউন ট্রেন চলে যাচ্ছে স্টেশনের দিকে। বাঁ হাত দিয়ে ফক্কা চোখ মোছে। হ্যান্ডেলে লাগানো এক গোছা লেকার্না ফুল এগিয়ে দেয় আমার দিকে। ফুলগুলো পিঠের ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়ে রেললাইন ধরে হাঁটা লাগালাম। ফক্কা দাঁড়িয়ে রইলো স্থির হয়ে।
কলকাতায় এসে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। তবে সপ্তাহের মধ্যে দু-তিনবার ফক্কার সঙ্গে কথা হতো। ক্রমে ব্যবধান ১৫ দিনে দাঁড়ালো। এইভাবে ব্যবধানের মেয়াদ ক্রমশ বেড়ে গেল। একদিন রবিবারের দুপুরে খেয়ে দেয়ে শুয়েছি। শরীরটা কয়েকদিন যাবত খুব একটা ভালো যাচ্ছিল না আমার, তাই দুপুরে কোনও কাজ রাখেনি, সম্পূর্ণ বিশ্রাম নেবার ইচ্ছাতে। অলস চোখ খবরের কাগজের উপর। চোখে এক আবছা অবয়ব। জল চাইছে। জল দাও, জল দাও। পিঠের ব্যাগে জলের বোতল। ওইখান থেকে জল দিতে বলছে। আচমকা ঘুম ভাঙে। লোডশেডিং, গোটা ঘরে গরমের দাপাদাপি। একটা বুনো পরিচিত ফুলের গন্ধ পাচ্ছি। লেকার্না। মোবাইলটা নিয়ে ফক্কাকে ফোন। পরিসীমার সীমার বাইরে। নিরুপায় হয়ে দুর্গা বাবুর নম্বর খুঁজছি। অনেকবার ফোন বাজে। ছুটির দিনে অফিসিয়াল ফোন ধরার তীব্র অনিচ্ছা।
“বলুন স্যার, কেমন আছেন।”
কুশল সংবাদ-এর গৌরচন্দ্রিকা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শেষ করে ফক্কার প্রসঙ্গ নিয়ে এলাম।
“কে ওই ছোকরা? আর বলবেন না স্যার। এই এক মাস হল চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। কোনও একটা কুরিয়ার কোম্পানিতে কাজ করছে। দিব্যি এখানে কাজ করতো, খাওয়া-থাকা সবই তো পেত। পড়াশোনার পাঠ তুলে দিয়ে ১৮ ঘণ্টা পিঠে ব্যাগ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দেখা হয় মাঝে মাঝে রাস্তাঘাটে। এরা আসলে এক জায়গায় থাকার লোক নয়। প্রথম থেকেই আমার আপত্তি ছিল, তাছাড়া...”
কেটে দিলাম ফোন ইচ্ছে করে।
খুব রাগ হলো আমার ফক্কার উপর। আগের মাসে কত কথা হলো। চাকরি ছেড়ে দেবার ইঙ্গিতটুকু ছিল না। হঠাৎ কোনও প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল হয়তো। কারণটা দুর্গাবাবুর তলিয়ে দেখার দরকার ছিল। নতুন চাকরিতে ধাতস্থ হবার পর হয়তো জানাতে পারে সবকিছু। দিন চলে যেতে লাগলো ঝড়ের গতিতে। ফক্কার কোনও ফোন এল না। দেখতে দেখতে বছর শেষ হয়ে গেল। অনেকবার চেষ্টা করেছিলাম ব্ল্যাকবোর্ড থেকে নামটা মুছে দিতে, কিন্তু ডাস্টারটা আটকে গিয়েছিল প্রত্যেকবার।
নতুন বছরের শুরুতে আবার কাজের সূত্রে বোলপুর। এবারে রাত্রিবাস নয়, একবেলার কাজ। আসার পথে রাস্তাঘাটে পিঠে ব্যাগ নেওয়া কুরিয়ারের ছেলেদের দিকে নজর রাখছি। কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা। আশানুরূপ উত্তরের স্থান শূন্য। ফেরার ট্রেনের অনেক আগে অফিস থেকে বেরোলাম। মেঠো রাস্তা, সাঁওতাল গ্রাম, ফক্কার বাড়ি। উঠোনের মধ্যে নিম গাছে ফক্কার জং ধরা সাইকেল চেন দিয়ে বাঁধা।
বেশি সময় থাকা গেল না। মেঠো রাস্তা ধরেছি এবার। সেই প্রহরীবিহীন লেভেল ক্রসিং। এবার সেখানে রেল দপ্তরের নোটিস। লাইনের উপর উঠে একদৃষ্টে লেকার্না ফুলের ঝোপের দিকে তাকিয়ে আছি। তীব্র মাঘের হাওয়ায় বিবর্ণ রূপ। অনাহতে সেই তরঙ্গ আসছে মন্দাক্রান্তা লয়ে। তরঙ্গ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। প্রাণ আর মনের ছেদবিন্দুতে বাসনার প্রদীপ। পা থেকে মাথা অব্দি কেঁপে উঠছে। পাশ দিয়ে ডাউন ট্রেন আওয়াজ তুলেছে। চোখ ঝাপসা। বাসনার প্রদীপ ক্রমে দাবানলের রূপ নিয়েছে। তরঙ্গে আচ্ছাদিত দেহ। ফক্কা একবার আয়, একবার আয় না রে, অনেকদিন তোকে দেখিনি।
প্রবল ধাক্কা। ছিটকে পড়লাম রেললাইনের ফুট তিনেক দূরে। আমার দাঁড়িয়ে থাকার লাইনের উপর দিয়ে এখন দ্রুতগতির ট্রেন। দুরন্ত তার ছুটে চলা। লেকার্না ঝোপগুলো তীব্র হাওয়ায় তছনছ।
“আরে দাদা, সিগনাল হয়ে যাওয়া লাইনের উপর কেউ দাঁড়িয়ে থাকে? ট্রেনটাকেও কি দেখতে পাননি? কী দরকার মশাই এই রাস্তা দিয়ে শর্টকাট করার? জীবনটাই তো শর্টকাট হয়ে যেত একটু হলে।”
উপদেশ-আদেশগুলো জানলায় ভিড় করে এসেছে। জানলার ভেতরে সাদা ক্যানভাসের উপর অস্পষ্ট প্রতিকৃতি। ধুমায়িত কুণ্ডলী, আকৃতি নেবার চেষ্টা করছে আপ্রাণ। জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়েছি এবার।
“এই তো ছয় মাস আগে। কুরিয়ারে কাজ করতো, একটা সাঁওতাল ছেলে, ব্যাগ নিয়ে যাওয়ার সময় বিচ্ছিরিভাবে কাটা পড়ল। তারপর থেকে...”
সজোরে জানলা বন্ধ করি। প্রতিকৃতি রূপ নিয়েছে। থর থর করে কাঁপছে। পাগল ছেলে। চলে যা হতভাগা, একদম ফক্কা হয়ে যাবি। ফিরতে আবার দেরি করিস না যেন।
কলকাতাগামী ট্রেন বোলপুর ছাড়ে। স্টেশন ক্রমে ক্ষুদ্র হতে হতে শূন্যে মিলিয়ে যায়।








Comments