ওষুধের পাশাপাশি জরুরি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন
- রোজকার অনন্যা

- Nov 8, 2025
- 3 min read
ডাঃ সুগত নারায়ণ বিশ্বাস
এমবিবিএস, এমডি (জেনারেল মেডিসিন), ডিএম (গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি)
কনসালট্যান্ট গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট, পিয়ারলেস হসপিটাল, কলকাতা

বুকের মাঝে হঠাৎ জ্বালা করছে? টক ঢেকুর উঠছে? রাতে ঘুমোতে পারছেন না? জিইআরডি নয় তো? কীভাবে চিনবেন? সামলাবেনই বা কী করে? চলুন জেনে নেওয়া যাক
জিইআরডি কী?
ডাঃ বিশ্বাস: আমরা যখন কোনও খাবার খাই বা জল পান করি, তখন তা খাদ্যনালির মাধ্যমে ওপর থেকে নীচের দিকে নামে। প্রথমে তা ইসোফেগাস বা খাদ্যনালি থেকে স্টমাক বা পাকস্থলীতে যায় এবং এরপর পাকস্থলী থেকে ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদান্ত্রে পৌঁছয়। কিন্তু যখন এর উল্টোটা হয়, তখনই দেখা দেয় রিফ্লাক্স। অর্থাৎ, খাবার বা তরল পাকস্থলী থেকে ক্ষুদ্রান্ত্র বা বৃহদান্ত্রে না গিয়ে বিপরীতমুখী হয়ে খাদ্যনালিতে উঠে আসে এবং বুকে জ্বালা, যন্ত্রণা হয়। একেই বলে গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ। সংক্ষেপে জিইআরডি। এর কারণে অনেক সময় স্বাভাবিক জীবনযাপন, কাজকর্ম ব্যাহত হয়।
এর কারণ কী?
ডাঃ বিশ্বাস: পুরোপুরি না হলেও, এর জন্য অনেকটাই দায়ী আমাদের জীবনযাপনের ধরন। যেমন
১. শরীরচর্চায় অনীহা ও সেডেন্টারি লাইফস্টাইল, ২. ঘরের খাবারের বদলে জাঙ্ক ফুড, ফাস্ট ফুড এবং বেশি পরিমাণে তেল–মশলা সহযোগে তৈরি রিচ খাবারের প্রতি আসক্তি, ৩. খাবার নির্দিষ্ট সময় না মানা বা একবার কিছু খেয়ে অনেকটা সময় না খেয়ে থাকা, ৪. রাতে দেরিতে খাওয়া বা খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়া, ৫. ঠিকমতো ঘুম না হওয়া। ঘুমে ব্যাঘাত হাইপার অ্যাসিডিটির সম্ভাবনা বাড়ায়, ৬. অতিরিক্ত মদ্যপান, ধূমপান, কোল্ড ড্রিঙ্কস, ৭. মানসিক চাপ বা স্ট্রেস ইত্যাদি জিইআরডি–র ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া যাঁরা খুব মোটা বা যাঁদের হাইটাস হার্নিয়া আছে, তাঁদের রিফ্লাক্সে ভোগার সম্ভাবনা বেশি।
এর উপসর্গ কী?
ডাঃ বিশ্বাস: বুকে জ্বালা বা হার্টবার্ন, টক ঢেকুর ওঠা, মুখ টক হয়ে থাকা বা মুখে খারাপ স্বাদ, বুকে বা পেটে ব্যথা, অল্প খেলেই পেট ভরে যাওয়া, বমি বা বমি বমি ভাব ইত্যাদি। এছাড়া দীর্ঘদিন রিফ্লাক্সে ভুগলে দাঁতে ক্ষয়জনিত সমস্যাও দেখা দিতে পারে। সপ্তাহে দু’বারের বেশি এইসব উপসর্গ দেখা দিলে এবং তা দু–তিনমাস ধরে চললে, বুঝতে হবে আপনি সম্ভবত জিইআরডি–তে ভুগছেন।
রোগ নির্ণয়ে কী কী পরীক্ষা–নিরীক্ষা রয়েছে?
ডাঃ বিশ্বাস: ক্লিনিক্যাল পরীক্ষাতেই রোগ নির্ণয় সম্ভব। রোগ নির্ণয়ের পর ওষুধ লেখার আগে আরও কিছু জিনিস দেখা দরকার। চার–পাঁচটি ওয়ার্নিং বা রেড ফ্ল্যাগ সাইন আছে, যেগুলো থাকলে ওষুধ লেখার আগে আরেকটু পরীক্ষা–নিরীক্ষা দরকার। যেমন— বারবার বমি হওয়া, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, গলায় খাবার আটকে যাওয়া, রক্ত বমি বা কালো পায়খানা, হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়া (আয়রণ ডেফিসিয়েন্সি অ্যানিমিয়া) এবং বয়স যদি ৫০ ঊর্ধ্ব হয়, তখন রোগ নির্ণয়ে এন্ডোস্কোপি করা হয়। এমনকী সিটি স্ক্যানেরও প্রয়োজন পড়তে পারে। জিআই ব্লিডিং হচ্ছে কিনা সেটাও দেখা জরুরি।
গলা, বুক জ্বালা বা টক ঢেকুর উঠলে অনেকেই ওভ্যার দ্যা কাউন্টার ওষুধ খান। এটা কতটা বিপজ্জনক?
ডাঃ বিশ্বাস: এটা একদমই নিরাপদ বা যুক্তিসঙ্গত নয়। কার কোন ওষুধ উপযুক্ত, সেটা একজন চিকিৎসকই ভালো বুঝতে পারেন। সেলফ প্রেসক্রিপশন বা ওভার দ্যা কাউন্টার ওষুধ একদমই নয়।

অনেক সময় দেখা যায় চিকিৎসক রোগীকে গ্যাস, অম্বলের ওষুধ ৭ দিন বা ১৫ দিন খাবার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু রোগী তা দীর্ঘদিন ধরে খেয়ে চলেন! এটা কতটা ক্ষতিকর?
ডাঃ বিশ্বাস: এটা কখনোই উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া একই ওষুধ দীর্ঘদিন খেয়ে গেলে একাধিক শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে যেমন কিডনির ক্ষতি পারে, তেমনই দেখা দিতে পারে ভিটামিন বি–১২, ভিটামিন ডি–র ঘাটতি। এমনকী কিছু গবেষণা বলছে, এতে নাকি ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে! যদিও সেটা খুবই বিরল।
রিফ্লাক্সের সমস্যা উপেক্ষা করলে কি কোনও জটিলতা দেখা দিতে পারে?
ডাঃ বিশ্বাস: যে উপসর্গগুলো বা রেড ফ্ল্যাগ সাইনের কথা বললাম, সেগুলো দেখা দিলে বিন্দুমাত্র উপেক্ষা করা উচিত নয়। কারণ অনেক সময় পেটে পলিপ বা টিউমার, আলসার ইত্যাদি থেকেও রিফ্লাক্স হতে পারে। আর সেগুলো যদি সঠিক সময় ধরা না পড়ে, তাহলে সেখান থেকে ব্লিডিং হতে পারে, খাদ্যনালী সরু হয়ে যেতে পারে, এমনকী ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে।
হঠাৎ করে রাতদুপুরে রিফ্লাক্সের সমস্যা হলে কী করণীয়?
ডাঃ বিশ্বাস: বাজারে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টাসিড সিরাপ রয়েছে। অধিক রাতে কোনও সমস্যার উপশমে বা আপৎকালীন পরিস্থিতির জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে ওই সিরাপ বা কিছু ওষুধ ঘরে রাখুন। তারপর পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আর মনে রাখবেন, সব রিফ্লাক্স এক নয়, উপসর্গও ভিন্ন। কারও শুধু বমি হয়, কারও বুকে জ্বালা করে, আবার কারও আলসার বা দাঁতে ক্ষয় হয়। উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা করতে হয়।
প্রতিরোধে কী করণীয়?
ডাঃ বিশ্বাস: ওষুধের পাশাপাশি জরুরি লাইফস্টাইল মডিফিকেশন। শুধুমাত্র জিইআরডি–ই নয়, হার্ট, লিভার, ফুসফুস–সহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ–প্রত্যঙ্গের সুস্থতার জন্য জরুরি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। যেমন
● জাঙ্ক ফুড, অতিরিক্ত তেল–মশলা দিয়ে তৈরি রিচ খাবার এড়িয়ে চলুন।
● কারও টকে সমস্যা, কারও থাকে দুধে সমস্যা (ল্যাক্টোসইনটলারেন্স), আবার কারও আটা, ময়দা বা ভাজাভুজি খেলে অসুবিধা হয়, যাঁর যেটাতে সমস্যা তাঁর সেটা এড়িয়ে চলাই ভালো।
● যদি শারীরিক কোনও সমস্যা (হার্টের অসুখ বা হাঁটু ব্যথা) না থাকে, তাহলে নিয়ম করে ৩০ মিনিট জোরে ঘাম ঝরিয়ে হাঁটুন।
● সেন্ট্রাল ওবেসিটি বা ভুঁড়ি কমাতেই হবে। পেটের মেদ কমলে রিফ্লাক্স থেকে অনেকটাই রেহাই সম্ভব।
● দরকার সঠিক সময় পর্যাপ্ত ঘুম।
● খাওয়া ও শোবার মাঝে ঘণ্টা দুয়েকের ব্যবধান রাখতেই হবে।
● জিইআরডি থাকলে মাথার বালিশ সামন্য উঁচু রাখুন (১৫ ডিগ্রি কোণে), এতে রিফ্লাক্সের ঝুঁকি একটু হলেও কমে।
● মদ্যপান, ধূমপান বা যে কোনও তামাকজাত দ্রব্য থেকে দূরে থাকুন।
ওষুধের পাশাপাশি যদি ডায়েট বা লাইফস্টাইল মডিফিকেশন না করেন, তাহলে জিইআরডি থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। জিইআরডি–র উপসর্গ বা রেড ফ্ল্যাগ সাইন দেখা দিলে দ্রুত গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্টের পরামর্শ নিন।








Comments