ফুসফুসের ভেতর লুকনো বিপদ !
- রোজকার অনন্যা

- Dec 11, 2025
- 2 min read
ডাঃ পল্লবিকা মণ্ডল
এমবিবিএস, এমএস (জেনারেল সার্জারি), এমসিএইচ (সার্জিক্যাল অঙ্কোলজি)
কনসালট্যান্ট অঙ্কো–সার্জেন, পিয়ারলেস হসপিটাল, কলকাতা

শরীরের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ফুসফুস। এর প্রধান কাজ অক্সিজেন গ্রহণ করে রক্তে সরবরাহ করা এবং শরীর থেকে কার্বন–ডাই–অক্সাইড বের করে দেওয়া। ফুসফুসের কোনও জায়গায় যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে কোষের বৃদ্ধি ঘটে, তখন তাকে আমরা ক্যান্সার বলি।
এর কারণ কী?
● ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রধান কারণ ধূমপান। তামাক পোড়া ধোঁয়া বছরের পর বছর ফুসফুসে জমে ক্যান্সারের সূত্রপাত করে।
● বর্তমানে নারীরা, এমনকি যাঁরা ধূমপান করেন না, তাঁদের মধ্যেও ফুসফুসের ক্যান্সারের হার বাড়ছে। এর কারণ ঘরোয়া জ্বালানির ধোঁয়া। কাঠ–কয়লা, খড়কুটো পোড়া ধোঁয়া নিঃশব্দে বিষের স্তর তৈরি করে ফুসফুসে।
● বায়ুদূষণের কারণে ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি রয়েছে, এটা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও, বাতাসে ভাসমান কার্বন কণা, বেঞ্জিনের মতো বিপজ্জনক কেমিক্যাল ফুসফুসের ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।
● ফুসফুসের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে বংশগত কারণ খুবই বিরল। এ নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে।
ফুসফুসের ক্যান্সারের কি কোনও উপসর্গ থাকে?
পুরুষদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা বেশি হওয়ায়, তাঁদের মধ্যে রোগটি বেশি দেখা যায়। উপসর্গও প্রথমে খুব সাধারণ—শুকনো কফ, দীর্ঘদিনের ক্রনিক কাশি, কখনও কফে রক্ত। সমস্যা হল, ব্রঙ্কাইটিস বা অ্যাজমার মতো অন্য অসুখের সঙ্গে এই লক্ষণগুলোকে প্রায় আলাদা করা যায় না। অসুখ যখন বাড়ে, তখন শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা বা রক্তসহ কফ বাড়তে থাকে। কিন্তু তখন অনেকটা দেরি হয়ে যায়। শুরুতেই ধরার মতো কোনও সহজ পরীক্ষা নেই, এই কারণেই দীর্ঘদিনের কফসহ কাশিকে কখনও অবহেলা করবেন না।
রোগ নির্ণয় কীভাবে?
রোগ নির্ণয়ে রয়েছে থোরাক্সের সিটি স্ক্যান। অনেক সময় ব্রঙ্কোস্কোপি বা পেট স্ক্যানেও ধরা পড়ে ফুসফুসে অসুখ বাসা বেঁধেছে কিনা। বিদেশে ধূমপায়ীদের জন্য নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা থাকলেও, ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে তা এখনও বাস্তবে রূপ পায়নি। প্রয়োজনে ব্যক্তিগত উদ্যোগেই স্ক্যান করাতে হয়।
সব টিউমারই ক্যান্সার নয়
ফুসফুসে দেখা যাওয়া প্রতিটি টিউমারই যে ক্যান্সার, তা নয়। ব্রঙ্কিয়াল ট্রির ভেতরের কিছু টিউমার, থোরাসিক অঞ্চলের থাইমাস বা ফ্যাট লেয়ারের টিউমার, এমনকি লিম্ফোমাও একই রকম উপসর্গ তৈরি করতে পারে।

এর চিকিৎসা কী?
● ফুসফুসে কোনও সন্দেহজনক গঠন দেখা গেলে প্রথমেই জরুরি বায়োপ্সি। এতে জানা যায় ক্যান্সারের ধরন। এরপর স্ক্যানের মাধ্যমে রোগের স্টেজ নির্ধারণ করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে অস্ত্রোপচারই সেরা পথ। ফুসফুসের আক্রান্ত অংশটি বাদ দিয়ে লিম্ফনোড পরিষ্কার করা হয়, যা সাধারণত মিনিম্যালি ইনভেসিভ সার্জারির মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।
● তৃতীয় স্টেজের পর চিকিৎসা চলে রেডিয়েশন বা কেমোথেরাপির মাধ্যমে। আর আজকের চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম চমক ইমিউনোথেরাপি, যা স্টেজ ফোর ক্যান্সারেও রোগীকে দীর্ঘ সময় নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করছে। নিয়মিত ফলোআপ, ওষুধ কতটা কাজ করছে তা নিরীক্ষা, সবই চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ।
বলা ভালো, অতীতের তুলনায় এখন ফুসফুসের ক্যান্সারের চিকিৎসার ফলাফল অনেকটাই আশাব্যঞ্জক। প্রথম ও দ্বিতীয় স্টেজে পুরোপুরি উপশমের সুযোগ দেয়; এমনকি তৃতীয় স্টেজেও রেডিয়েশন থেরাপি রোগীকে কিওর করতে পারে।
প্রতিরোধে কী করণীয়?
ধূমপান—ফুসফুসের ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় কারণ, সবচেয়ে বড় শত্রু। ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই দায়ী এই একটিই অভ্যাস। ধূমপান থেকে দূরে থাকলে, ফুসফুসের ক্যান্সারও দূরে থাকবে।
মনে রাখুন
ক্রনিক কাশি, রক্তসহ কফ, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট, বুকে ব্যথা—এসব লক্ষণকে কখনই অবহেলা করবেন না। ফুসফুসের ক্যান্সার সাধারণত উচ্চ–সন্দেহ ছাড়া প্রথমেই ধরা পড়ে না। তাই কোনও উপসর্গকে অবহেলা না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া–ই রোগটি থেকে নিজেকে রক্ষা করার প্রথম ধাপ।








Comments