গলা ব্যথা হলেই ওভার দ্যা কাউন্টার অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না..
- রোজকার অনন্যা

- Sep 14, 2025
- 4 min read
ডাঃ শৌভনিক শতপথি
এমবিবিএস, এমএস (ইএনটি)
সিনিয়র কনসালট্যান্ট ইএনটি হেড অ্যান্ড নেক সার্জেন, পিয়ারলেস হসপিটাল, কলকাতা

শীত মানেই উৎসবের মরশুম। ঘোরাঘুরি, খাওয়াদাওয়া, বিয়েবাড়ি আরও কত কী। এইসব কিছুতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে যদি কোনও শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। এই সময় সবচেয়ে বেশি ভোগায় গলা ব্যথা, জ্বর, সর্দি, কাশি। আজ আমাদের আলোচনার বিষয় গলা ব্যথা। কেন হয় গলা ব্যথা এবং এর প্রতিরোধে কী করণীয়?
গলা ব্যথা কেন হয় বা গলা ব্যথা বলতে গলার কোন অংশের সংক্রমণকে বোঝায়?
গলায় ফ্যারিংস বলে একটি অংশ আছে। যাকে বাংলায় বলে গলবিল। ফ্যারিংসের অবস্থান মুখগহ্বর ও নাসিকা গহ্বরের পেছনে এবং খাদ্যনালী ও শ্বাসনালীর ওপরের দিকে। এই ফ্যারিংসে কোনও কারণে যদি সংক্রমণ হয়, তখন তাকে বলে ফ্যারিঞ্জাইটিস। ফ্যারিঞ্জাইটিসে খুব কমন সমস্যা গলা ব্যথা। গলা ব্যথার সঙ্গে দেখা দেয় আরও কিছু উপসর্গ। যেমন খাবার গিলতে সমস্যা, জ্বর ইত্যাদি। ফ্যারিংসের মধ্যেই রয়েছে টনসিল। টনসিলে সংক্রমণ হলেও এই একই সমস্যা বা উপসর্গ দেখা দেয়। যদি শুধুমাত্র টনসিলে সংক্রমণ হয়, তখন তাকে বলে টনসিলাইটিস। আর টনসিল এবং ফ্যারিংস একসঙ্গে সংক্রমিত হলে, তাকে বলে টনসিলোফ্যারিঞ্জাইটিস। যাঁদের ছোটবেলা থেকে টনসিলাইটিসের ধাত থাকে, তাঁদের মরশুম বদলের সময় গলায় সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে। বেশিরভাগক্ষেত্রেই গলার সংক্রমণ ভাইরাসঘটিত। এই সংক্রমণ শুধুমাত্র গলায় হতে পারে বা আপার রেসপিরেটরি ট্র্যাক্টেও হতে পারে। যা থেকে সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা হয়। গলায় এই ভাইরাসঘটিত অসুখের শুরু হয় গলা খুসখুস দিয়ে। যেটাকে বলা হয় ফরেন বডি সেনসেশন। তারপর ধীরে ধীরে গলা ব্যথা, ঢোক গিলতে বা খাবার খেতে কষ্ট, শুরু হয় হালকা জ্বর আসা।
এত গেল সাধারণ গলা ব্যথার কথা। তবে গলা ব্যথা সবসময় সাধারণ নাও হতে পারে। যেমন কারও যদি টনসিলাইটিস হয় বা টনসিলাইটিসের ধাত থাকে এবং সঠিক সময় যদি সেটা ডায়াগনোসিস না করা হয়, তাহলে টনসিলের সংক্রমণ টনসিল থেকে গলায় ছড়িয়ে পড়লে, অনেক সময় গলায় পুঁজও জমে যায়। যাকে বলে পেরিটনসিলার এবসেস বা প্যারাফ্যারিঞ্জিয়াল এবসেস। যেটা কিন্তু মারাত্মক। কারণ এতে শ্বাসনালীর উপর চাপ পড়ে জীবনের ঝুঁকি পর্যন্ত দেখা দিতে পারে। এই জন্য গলা ব্যথাকে সব সময় নর্মাল কোনও সমস্যা বলে মনে করা উচিত নয়। গলা ব্যথা অনেক অসুখের প্রারম্ভিক উপসর্গ হতে পারে। ফ্যারিংসের নীচে রয়েছে ভয়েসবক্স বা ল্যারিংস। যদি সংক্রমণ ফ্যারিংস থেকে ল্যারিংসের দিকে যায়, তখন তাকে ল্যারিঞ্জাইটিস বা ল্যারিঙ্গোফ্যারিঞ্জাইটিস বলে। সেক্ষেত্রে গলা ব্যথার সঙ্গে গলার আওয়াজেও পরিবর্তন হয়, অর্থাৎ গলা বসে যায়। এতে অনেক সময় কথা বলতে গেলে গলায় ব্যথা হয়।
রোগ নির্ণয় কীভাবে?
গলা ব্যথার ধরন বা উপসর্গ দেখে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকরা বুঝতে পারেন কোনটা টনসিলাইটিস, কোনটা টনসিলোফ্যারিঞ্জাইটিস বা কোনটা ল্যারিঙ্গফ্যারিঞ্জাইটিস। ভাইরাল সংক্রমণের মাধ্যমে গলায় সংক্রমণের সূত্রপাত হলেও ক’দিন পড়েই সেটা ব্যাকটিরিয়াল সংক্রমণে পরিণত হয়। প্রশ্ন হল সেটা বুঝবো কী করে? যদি জ্বর না কমে বা গলা ব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং তার সঙ্গে কফ তৈরি হয়, কফের রং গাঢ় হলুদ বা কফের সঙ্গে অল্প অল্প রক্তের ছিটে যায়, তখন বুঝতে হবে ব্যাকটিরিয়াঘটিত সংক্রমণের বাড়বাড়ন্ত বেশ ভালো রকমই হয়েছে এবং তখন বাড়তি সর্তকতা দরকার।
এর চিকিৎসা কী?
যেহেতু এটা ভাইরাল ইনফেকশন দিয়ে শুরু হয়, তাই এর চিকিৎসায় প্রথমদিকে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনও ভূমিকা নেই। এখন তো গলা ব্যথা হলেই মানুষজন ওভার দ্যা কাউন্টার অ্যান্টিবায়োটিক খেতে শুরু করেন! এতে রোগের তো উপশম হয়–ই না, উল্টে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের সম্ভাবনা দেখা দেয়। গলা ব্যথা হলে গরম জলে গার্গেল করুন। গরম গরম খাবার খান। যদি সর্দি থাকে তাহলে অ্যান্টি–অ্যালার্জি ওষুধ খেতে পারেন। নিতে হবে বিশ্রাম। অধিকাংশক্ষেত্রে এতেই উপশম মেলে। যদি দিন–দুয়েকের মধ্যে এইসবে কোনও উপকার না হয়, উল্টে উপসর্গগুলো আরও বাড়ে, জ্বর বাড়তে থাকে, তখন অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। গলা ব্যথা হলেই প্রথমে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনও ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। অধিকাংশই ভাইরাল সংক্রমণ এবং তিন–চারদিনের মধ্যে গরম জলে গার্গেল, বিশ্রাম ইত্যাদিতে ঠিক হয়ে যায়। যদি টনসিল থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পেরিটনসিলাটাইটিস বা টনসিলার এবসেস বা প্যারাফ্যারিঞ্জাল এবসেস হয়, তাহলে রোগীকে হসপিটালে ভর্তি করা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না। প্রয়োজন পড়ে ইন্ট্রাভেনাস অ্যান্টিবায়োটিকের। পুঁজ জমে গেলে পুঁজ বের করার জন্য সার্জারি করতে হয়।
এই সময়ের একটা সমস্যা নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া। নাক বন্ধ হলে কী করণীয়?
আপার রেসপিরেটরি ট্র্যাক্টে ভাইরাল সংক্রমণে নাক বন্ধ হতে পারে। কারণ নাকেও প্রদাহ হয়। অনেকেই নাক বন্ধ হলেই ওভার দ্যা কাউন্টার নেজাল ড্রপ কিনে নাকে দিতে শুরু করেন। এটা কিন্তু মারাত্মক ভুল কাজ। এই ড্রপ স্বল্প সময়ের জন্য দেওয়া গেলেও, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নাকের ড্রপ ব্যবহার করা উচিত নয়। দীর্ঘদিন ধরে ওভার দ্যা কাউন্ডার এইসব ড্রপ নাকে দিলে নাকে নানা অসুখের সূত্রপাত হতে পারে। যেমন ড্রপ না দিলে নাক খুলতেই চাইবে না। তখন সার্জারি করে সেটাকে ঠিক করা ছাড়া আর কোনও রাস্তা থাকে না। তাই নাকের ড্রপ দেবার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আর নাক বন্ধ হলে প্রথমেই ড্রপ না দিয়ে গরম জলের স্টিম বা ভাপ নিন, এতে নাক বন্ধের সমস্যায় উপশম মেলে।

গলা ব্যথা প্রতিরোধের উপায় কী?
শীতের আমেজ আসতে শুরু করলে সবারই মন চায় একটু ঘুরে–বেড়াতে। শুরু হয় খাবারদাবারে অনিয়ম। সত্যিই তো শীত উপভোগেরই সময়। নিশ্চয়ই ঘুরবেন, খাওয়াদাওয়া করবেন, আনন্দ করবেন; কিন্তু দরকার একটু সচেতনতা—
● খেয়াল রাখবেন হুট করে যেন ঠান্ডা না লাগে। এমন পোশাক পরুন যাতে ঠান্ডা না লাগে। নাক, কান দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া যাতে শরীরে প্রবেশ করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখুন।
● ঠান্ডা খাবার যেমন আইসক্রিম, কোল্ড ড্রিংস ইত্যাদি থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকুন। টকজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন।
● পান করতে হবে পরিমিত পরিমাণ জল। শীতে তেষ্টা পায় না বলে আমাদের জল পানের পরিমাণ কমে যায়। শরীরকে হাইড্রেট রাখতে পরিমিত পরিমাণ জল পান জরুরি।
● ভিটামিন সি সমৃদ্ধ পুষ্টিকর খাবার খান। এতে শরীরে ইমিউনিটি ঠিক থাকবে। যেমন মরশুমি ফল কমলালেবু।
● অসুখটা যেহেতু ভাইরাল তাই একজনের থেকে আরেকজনের শরীরে ছাড়ানোর সম্ভাবনা থাকে। তাই সংক্রমণ শরীরে বাসা বাঁধলে মাস্ক পরুন। এতে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা অনেকটাই কমে।
● যাঁদের নিয়মিত টনসিলাইটিস হয় বা যাঁদের ফ্যারিঞ্জাইটিজের ধাত আছে, তাঁরা ঋতু পরিবর্তনের একমাস আগে থেকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করুন। যেমন রাতে বেরোলে গলা, নাক, কান ঢেকে বের হোন। রাতে শোবার আগে প্রতিদিন গার্গেল করুন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অ্যান্টি–অ্যালার্জি ওষুধ খান। খেতে হবে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার। আর টক ও ঠান্ডা খাবার এড়িয়ে চলুন। তাহলেই ঋতু পরিবর্তনের সময় সংক্রমণের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে।
এই সামান্য কটা জিনিস মানলেই কিন্তু অসুখ থেকে দূরে থাকা যায় এবং শীতের মরশুমকে উপভোগ করা যায়।








Comments